সাইবার আইন নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগ বিবেচনার আশ্বাস

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১২ বার
সাইবার আইন নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগ বিবেচনার আশ্বাস

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রস্তাবিত সাইবার আইন নিয়ে সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। আইন প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সাংবাদিকদের যেসব উদ্বেগ রয়েছে, আইন তৈরির সময় সেগুলো বিবেচনায় রাখা হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ব্যক্তিকে বিতর্কিত করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে প্রস্তাবিত সাইবার আইন নিয়ে সরকারের পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং আইনটির সম্ভাব্য লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও চূড়ান্ত আইনে কী ধরনের বিধান থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মন্ত্রী জানিয়েছেন, আইনটির খসড়া প্রণয়নের কাজ এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে আইনটির পরিধি, প্রয়োগপদ্ধতি এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত সাইবার আইন নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে অংশীজনদের প্রতিক্রিয়া একরকম নয়; বরং নানা ধরনের মতামত সামনে আসছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে যেভাবে অপমান, হয়রানি ও আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে এবং এআই ব্যবহার করে যেভাবে কাউকে বিতর্কিত পরিস্থিতিতে ফেলা হচ্ছে, সেসব ক্ষতি থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য শক্তিশালী আইন প্রয়োজন—এ বিষয়ে অনেকেই একমত হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবন ক্রমেই অনলাইননির্ভর হয়ে উঠছে। যোগাযোগ, সংবাদ প্রচার, মতামত প্রকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভুয়া পরিচয়ে হয়রানি, অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতা অনলাইন পরিবেশে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এআই ব্যবহার করে ছবি, অডিও বা ভিডিও পরিবর্তন করা কিংবা বাস্তবের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি করে কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক, কর্মজীবন এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে দীর্ঘ সময় ধরে অপমান ও সন্দেহের মুখোমুখি হতে হয়। এ পরিস্থিতিতে কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত প্রতিকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তবে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় শক্তিশালী আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইনের অপব্যবহার ঠেকানোর নিশ্চয়তাও জরুরি। ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যেন নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন, সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকাশনা অযথা বাধাগ্রস্ত না হয় এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়—এসব বিষয় আইন প্রণয়নের সময় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। কোনো বক্তব্য বা প্রকাশনা অপরাধের পর্যায়ে পড়বে, কীভাবে অভিযোগ যাচাই করা হবে এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের সুরক্ষা থাকবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলে আইনটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।

সাংবাদিকদের উদ্বেগ বিবেচনায় রাখার বিষয়ে আইনমন্ত্রীর আশ্বাস এ কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু তথ্য প্রকাশ নয়; বরং ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সামনে আনার ক্ষেত্রেও সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ডিজিটাল মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ালে তার দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি থাকা জরুরি।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগে সাংবাদিক সংগঠন, আইনজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের মতামত নেওয়া হলে আইনটি আরও বাস্তবসম্মত হতে পারে। কারণ প্রযুক্তিগত অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কোনো আইন কার্যকর করতে হলে অপরাধের সংজ্ঞা, তদন্তের পদ্ধতি, ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, অভিযোগকারীর সুরক্ষা এবং অভিযুক্তের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন।

এদিকে একই অনুষ্ঠানে আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেছেন, কোনো আইনজীবী অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাঁর পেশাগত অবস্থান বা প্রভাব যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বার কাউন্সিল আইনের আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যে আইন পেশায় জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত আইন শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির অনুষ্ঠানে এসব বক্তব্য আসে। এজিও-ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের দ্বিতীয় ব্যাচের সমাপনী এবং তৃতীয় ব্যাচের ইন্টার্নদের বরণ উপলক্ষে কনভোকেশন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিক্স এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আইন শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি শিক্ষাজীবনে অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করে। আদালত, আইন প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ আইনজীবীরা পেশাগত দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার সুযোগ পান। বিচারপ্রার্থী মানুষের অধিকার রক্ষা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পেশাগত সততা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে আইনজীবীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে অঙ্গীকার উঠে এসেছে, তা এই পেশাগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এদিকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনজীবী হিসেবে পেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণ করেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল ও বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট বার কাউন্সিল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এটি ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

আইনজীবী হিসেবে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আইন পেশায় যোগ দিতে আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা অন্য বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বা কর্মজীবনের একটি পর্যায় অতিক্রম করে আইন পেশায় আসতে চান, তাঁদের জন্য সিদ্ধান্তটির প্রভাব থাকতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্তের বিস্তারিত প্রয়োগপদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট যোগ্যতার শর্ত এবং কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রযোজ্য নিয়ম সম্পর্কে বার কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা জানা আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে, একই দিনে আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে আইন প্রণয়ন, নাগরিক সুরক্ষা এবং পেশাগত জবাবদিহির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। একদিকে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে সেই আইন যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার বৈধ কার্যক্রমে অযৌক্তিক বাধা সৃষ্টি না করে, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আইন পেশায় নৈতিকতা বজায় রাখা এবং আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণ বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

প্রস্তাবিত সাইবার আইনের চূড়ান্ত রূপ এখনও নির্ধারিত না হওয়ায় এখন নজর থাকবে পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া, খসড়ার ভাষা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় গৃহীত ব্যবস্থার দিকে। আইনটি যদি অনলাইন হয়রানি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে পারে, তাহলে তা ডিজিটাল পরিবেশে জনআস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com