আরামকো ভবনে আবারও হামলা, সৌদিতে বাড়ছে উত্তেজনা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১০ বার
আরামকো ভবনে আবারও হামলা, সৌদিতে বাড়ছে উত্তেজনা

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবন লক্ষ্য করে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় ভবনটিতে আগুন ধরে গেলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়। ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর ভবনে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করে। তবে হামলাটি কোন ধরনের অস্ত্র দিয়ে চালানো হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। একই সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঘিরে হামলা-পাল্টা হামলার খবর সামনে আসায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

এই হামলার আগে মঙ্গলবার ইয়েমেনের রাজধানী সানায় তেল স্থাপনাগুলোর আশপাশে অবস্থানরত কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার সতর্কতা দিয়েছিল হুতিরা। গোষ্ঠীটি এসব স্থাপনাকে সম্ভাব্য ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করে। এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানার আল-সাবাহ এলাকায় ইয়েমেন অয়েল কোম্পানির একটি কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশের পরই হুতিদের পক্ষ থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি আসে।

হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সতর্ক করে বলেছিলেন, সানায় হামলা হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেওয়া হবে। এরপর সানায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সৌদি-সমর্থিত বাহিনী রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে হামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলে ঘটনাটির সব দিক নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সানার আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ ছাড়া রাস ঈসা বন্দরের তেল সংরক্ষণ ট্যাংক এবং হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন হোদেইদা প্রদেশের একটি তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে আরও দুই দফা বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলার লক্ষ্য ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকির অভিযোগ, হুতিরা তেল স্থাপনা এবং ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপোগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অস্ত্রভান্ডার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে জোটের সামরিক পদক্ষেপের যুক্তি তুলে ধরা হলেও স্থাপনাগুলোর প্রকৃত ব্যবহার এবং সেখানে সামরিক সরঞ্জাম মজুত থাকার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ইয়েমেন অয়েল কোম্পানি আগেই জানিয়েছিল, তাদের তেল সংরক্ষণাগারগুলো খালি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ফলে এসব স্থাপনায় হামলা হলেও তেলের মজুত কিংবা সাধারণ মানুষের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।

তবে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সানার কয়েকটি পেট্রলপাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। সংঘাতের সময় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যুদ্ধের সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও এ ধরনের অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার খবর পাওয়া গেছে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাতে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদের দিকে অগ্রসর হওয়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়। সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হন এবং ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মঙ্গলবার রিয়াদের উত্তরে তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার রিয়াদে আরামকোর সদর দপ্তর, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আরামকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শোধনাগারের আশপাশ থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। এসব সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল ও দৈনন্দিন কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এর আগে শনিবার (১০ অক্টোবর) রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর দেওয়া হয়েছিল। পরদিন রিয়াদের বিমানবন্দরে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে আরও একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ধারাবাহিক হামলার খবর সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও পড়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরব ও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত বা সীমিত করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোন রুটে কত দিনের জন্য ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার হালনাগাদ ঘোষণার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক পরিবহন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।

সৌদি আরবের মন্ত্রিসভা মঙ্গলবারের বৈঠকে হুতিদের হামলার জন্য তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের বরাতে সৌদি প্রেস এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। সৌদি আরবের স্বার্থ রক্ষায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে সহযোগিতার আহ্বান জানাতে পারেন বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সংঘাতটি শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর সংঘাতের প্রভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেন, সৌদি আরব এবং আশপাশের দেশগুলোতে হামলা-পাল্টা হামলা বাড়লে নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিমান চলাচলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আরামকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে, যদিও প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হচ্ছে তার ওপর।

ধাহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে আগুন লাগলেও কোনো প্রাণহানির খবর না পাওয়া তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তির বিষয়। কিন্তু ধারাবাহিক হামলা এবং পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা ও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এর মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বাড়তে পারে। তাই হামলার ঘটনা তদন্ত, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং উত্তেজনা কমাতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ—সবকিছুই এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com