প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর শেরেবাংলানগরে পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠের জায়গায় নতুন বাংলাদেশ সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রায় ৩১ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হবে নতুন প্রশাসনিক কমপ্লেক্স। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২০২৯ সালে নতুন স্থানে সচিবালয়ের অফিস কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রোববার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে নতুন সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সিদ্ধান্তের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠ এলাকায় একটি আধুনিক ও সমন্বিত প্রশাসনিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের নতুন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বর্তমান সচিবালয়ের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে প্রশাসনের কেন্দ্রীয় দপ্তরকে আরও আধুনিক পরিবেশে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন কমপ্লেক্সে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, যানবাহন পার্কিং, সভা ও বহুমুখী কার্যক্রমের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ফলে এটি শুধু একটি অফিস ভবন নির্মাণের প্রকল্প নয়, বরং সরকারের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোকে নতুন পরিবেশে পুনর্বিন্যাসের একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদসচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন সচিবালয় নির্মাণের জন্য শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠের প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে মোট প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট স্পেসসংবলিত ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। ভবনগুলোর নিচে থাকবে তিনটি বেজমেন্ট। এসব অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে বিপুলসংখ্যক যানবাহন রাখার ব্যবস্থাও থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্সে মোট প্রায় ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হবে। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। রাজধানীর অন্যতম বড় সমস্যা যানবাহন পার্কিংয়ের সংকট। বর্তমান সচিবালয় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক সরকারি গাড়ি, কর্মকর্তা-কর্মচারীর যানবাহন এবং বিভিন্ন কাজে আসা মানুষের গাড়ি ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন কমপ্লেক্সে পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা থাকলে এই চাপ অনেকটাই কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নতুন সচিবালয়ের নকশায় প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় কিছু সহায়ক সুবিধাও রাখা হয়েছে। কমপ্লেক্সে একটি মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি মাল্টিপারপাস হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া এবং একটি ডাকঘর থাকবে। ফলে একটি বড় সরকারি প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধা একই স্থানে পাওয়া যাবে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সবুজায়ন ও জলাধারের ব্যবস্থা। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখা হবে। ঢাকার ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, পরিবেশগত চাপ, জলাবদ্ধতা এবং উন্মুক্ত জায়গার সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি বড় সরকারি কমপ্লেক্সে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সবুজ এলাকা ও জলাধার রাখার পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাস্তবে এই পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক ভবনের পাশাপাশি একটি তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরির সুযোগ থাকবে।
বর্তমান সচিবালয় প্রায় ১৭ একর জায়গার ওপর নির্মিত। এর তুলনায় নতুন সচিবালয়ের জন্য নির্ধারিত জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। ফলে নতুন কমপ্লেক্সে ভবনের পাশাপাশি পার্কিং, সবুজায়ন, জলাধার ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সমন্বিতভাবে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ কারণেই নতুন স্থানটিকে ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নতুন সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনার সঙ্গে স্থাপত্যগত বিষয়টিও বিশেষভাবে যুক্ত। মন্ত্রিপরিষদসচিব জানিয়েছেন, স্থপতি লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপনের লক্ষ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করেছে। ফলে নতুন সচিবালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে শেরেবাংলানগরের বৃহত্তর স্থাপত্য পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
লুই আই কান বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। শেরেবাংলানগরে জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের স্থাপত্য পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর পরিকল্পনা গভীরভাবে যুক্ত। সেই বৃহত্তর স্থাপত্য ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন সচিবালয় নির্মাণ করা হলে শেরেবাংলানগর এলাকায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি পরিকল্পিত স্থাপত্যিক সংযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ভবনের নকশায় আধুনিক প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং পরিবেশগত বিষয়কে সমন্বয় করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯ সালে নতুন স্থানে অফিস কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। এত বড় একটি প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিস্তারিত নকশা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, নির্মাণকাজ, ভবনগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর স্থানান্তরের মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হলে এসব কার্যক্রমের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
এদিকে নতুন সচিবালয় স্থাপনের পাশাপাশি একই মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রশাসন ও সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও রয়েছে। মন্ত্রিসভা মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার অনুমোদন দিয়েছে। নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি কাঠামোয় নারী ও শিশু বিষয়ক কার্যক্রমকে নতুনভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। সরকারের মতে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ হ্রাসে এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়টিও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০ প্রণয়ন করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে তৈরি এই কৌশলপত্রের আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকার প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তগুলো একই মন্ত্রিসভা বৈঠকে হওয়ায় প্রশাসনিক অবকাঠামো আধুনিকায়নের পাশাপাশি জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকেও সরকারের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। নতুন সচিবালয় প্রকল্পে সবুজায়ন ও জলাধারের সংস্থান এবং একই সময়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি অবকাঠামোতে পরিবেশবান্ধব ধারণার ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা রাজধানীর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমান সচিবালয় দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সরকারি দপ্তরের সংখ্যা, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা, যানবাহন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বেড়েছে। ফলে পুরনো অবকাঠামোর ওপর চাপও বেড়েছে। নতুন কমপ্লেক্সে পরিকল্পিত জায়গা, আধুনিক ভবন ও পর্যাপ্ত পার্কিং থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছু বাস্তব সমস্যা কমানোর সুযোগ থাকবে।
তবে নতুন সচিবালয়ের সুফল নিশ্চিত করতে শুধু ভবন নির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রশাসন, নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো, গণপরিবহন সংযোগ এবং নাগরিক সেবা গ্রহণের সুবিধাকেও পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে এত বড় সরকারি কমপ্লেক্সের কারণে শেরেবাংলানগর ও আশপাশের এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়বে কি না, সেটিও আগেভাগে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
২০২৯ সালে নতুন সচিবালয়ে অফিস শুরু করার লক্ষ্য তাই সরকারের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময়সীমা নির্ধারণ করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী কয়েক বছরে শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠের চেহারা বদলে সেখানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কমপ্লেক্স গড়ে উঠবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে আধুনিক ভবন, বিপুল পার্কিং সুবিধা, সবুজ এলাকা, জলাধার এবং বিভিন্ন সহায়ক অবকাঠামো।
সব মিলিয়ে, নতুন সচিবালয় স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন রাজধানীর প্রশাসনিক অবকাঠামোতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণ, প্রায় ৩৩ লাখ বর্গফুট জায়গা, ১৪টি ১২ তলা ভবন, তিনটি বেজমেন্ট, প্রায় ৩ হাজার ৮০০ গাড়ি রাখার ব্যবস্থা এবং প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে এটি একটি বড় আকারের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো প্রকল্প। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০২৯ সালে নতুন সচিবালয়ে কার্যক্রম শুরু করা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত