এক লাখ ২৪ হাজার এনআইডি সংশোধনের অপেক্ষায়

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
এক লাখ ২৪ হাজার এনআইডি সংশোধনের অপেক্ষায়

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডিতে সামান্য একটি ভুলও একজন নাগরিকের জন্য কতটা বড় ভোগান্তির কারণ হতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ ছড়িয়ে আছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কারও নিজের নাম ভুল, কারও জন্মতারিখে অসঙ্গতি, আবার কারও বাবা-মায়ের নাম কিংবা বয়সের তথ্যও সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি। এসব ভুল সংশোধনের জন্য আবেদন করার পরও অনেক নাগরিককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কয়েক বছর ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুরছেন, কেউ একাধিকবার আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাচ্ছেন না।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় এক লাখ ২৪ হাজার জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদনের বড় একটি অংশ নাম ও বয়স সংশোধনসংক্রান্ত। অনেক আবেদন একবার নয়, একাধিকবার বাতিল হওয়ার পর পুনরায় আবেদন করা হয়েছে। ফলে একদিকে নাগরিকদের সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ এই পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধনের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।

জাতীয় পরিচয়পত্র বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি। ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট করা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ, জমিজমা-সংক্রান্ত কাজ, চাকরি, শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় এনআইডির তথ্য প্রয়োজন হয়। ফলে পরিচয়পত্রে থাকা একটি ভুল তথ্য কেবল একটি কার্ডের ভুল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে সেটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, সংশোধনের আবেদন করার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক সময় তাদের জানতে হচ্ছে আবেদন বাতিল হয়েছে। এরপর আবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, আবেদন, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য এই প্রক্রিয়া আরও কষ্টকর হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজের এনআইডি সংশোধনের আবেদন বাতিল হওয়ার বিষয়টি জানতে যান ৭৬ বছর বয়সী উজ্জ্বল রানী সাহা। ২০১৭ সালে সংশোধনের জন্য আবেদন করার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত শারীরিক কষ্ট নিয়েই লাঠিতে ভর করে তাকে নির্বাচন ভবনে যেতে হয়েছে। তাঁর এনআইডিতে জন্মতারিখ, নিজের নাম এবং স্বামীর নামের বানানে ভুল রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

এই ভুলের বাস্তব প্রভাবও কম নয়। উজ্জ্বল রানীর ভাষ্য অনুযায়ী, এনআইডির তথ্যের অসঙ্গতির কারণে তিনি পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়াতে পারেননি। এর ফলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভারতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন থাকলেও সেটি সম্ভব হয়নি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও সংশোধন না হওয়ায় দীর্ঘদিনের এই অপেক্ষা তাঁর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।

একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন শহিদুল ইসলাম। তাঁর এনআইডিতে নিজের নামের জায়গায় অন্য একটি নাম লেখা হয়েছে। শুধু নিজের নাম নয়, পিতা-মাতার নামেও ভুল রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ২০২৪ সালে সংশোধনের আবেদন করার পর তদন্তের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পরও সমাধান না পাওয়ায় চলতি বছরের জুনে তিনি নির্বাচন কমিশনের সচিবের কাছে আপিল করেছেন। একটি পরিচয়পত্রের ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য বছরের পর বছর ধরে তাকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

মনির হোসেনের সমস্যাটিও ভিন্ন ধরনের। তাঁর অভিযোগ, এনআইডিতে তাঁর ফুফাতো ভাইয়ের নাম, পরিচয় ও বয়স যুক্ত হয়ে গেছে। নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রমাণ করতে গিয়ে তাকে পুরোনো নথি সংগ্রহের চেষ্টাও করতে হয়েছে। পুরোনো ছবিযুক্ত পরিচয়পত্রের প্রমাণ চাওয়া হলে তিনি ১৯৯৭ সালে নেওয়া টিঅ্যান্ডটির ল্যান্ডফোন সংযোগের নথি খুঁজে বের করে জমা দিতে এসেছেন। কয়েক দশক আগের একটি নথি সংগ্রহের এই প্রচেষ্টা দেখিয়ে দেয়, পরিচয় সংশোধনের প্রক্রিয়া অনেক নাগরিকের জন্য কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

শাকিল হোসেনও দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। ২০২৩ সাল থেকে এনআইডির তথ্য সংশোধনের জন্য চেষ্টা করছেন তিনি। এরই মধ্যে তাঁর আবেদন দুবার বাতিল হয়েছে। বারবার আবেদন, কাগজপত্র জমা, অপেক্ষা এবং আবার নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করার কারণে নাগরিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—একটি ভুল তথ্য সংশোধনে এত দীর্ঘ সময় কেন প্রয়োজন হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক (পরিচালনা) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মহাপরিচালকের এখতিয়ারভুক্ত ৬৯ হাজার ২৫২টি আবেদনসহ সারা দেশে প্রায় এক লাখ ২৪ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদনের বড় অংশ নাম ও বয়স সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে এনআইডির তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সতর্কতারও যৌক্তিক কারণ রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম, জন্মতারিখ ও বয়সের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছামতো পরিবর্তনের সুযোগ থাকলে সেটি অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। একজনের পরিচয় অন্যজনের নামে পরিবর্তন করা, বয়স কমানো বা বাড়ানো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে তথ্য পরিবর্তনের মতো অনিয়ম ঠেকাতে আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। ফলে দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কমিশনের জন্য বড় দায়িত্ব।

ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও বলেছেন, এনআইডি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি। পুরো নাম ও বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। কারণ এসব তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে কেউ অসৎ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণে প্রতিটি আবেদন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অপেক্ষমাণ আবেদন কমানোর উদ্যোগও রয়েছে। এনআইডি মহাপরিচালক এইচ এম আনোয়ার পাশা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। প্রতিটি আবেদন ধাপে ধাপে যাচাই করা হয়। এই গতিতে কাজ অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

তবে শুধু আবেদন নিষ্পত্তির সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, নাগরিকদের জন্য পুরো সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ একজন নাগরিককে যদি একই ভুল সংশোধনের জন্য বারবার দপ্তরে যেতে হয়, পুরোনো কাগজপত্র খুঁজে বের করতে হয় কিংবা বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে প্রশাসনিক সেবার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বিশেষ করে প্রবীণ, অসুস্থ, প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা এবং যাদের প্রয়োজনীয় পুরোনো নথি সংগ্রহ করা কঠিন—তাদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের কাছে এনআইডির ভুল সংশোধন শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়; এর সঙ্গে চিকিৎসা, ভ্রমণ, শিক্ষা, চাকরি, আর্থিক লেনদেন কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনের মতো বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে থাকে।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সংশোধনের আবেদন করার সময় সঠিক ও প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। পুরোনো পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্ট বা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নথির তথ্যের সঙ্গে এনআইডির তথ্যের সামঞ্জস্য থাকলে যাচাই প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। তবে কোন ক্ষেত্রে কোন নথি প্রয়োজন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এক লাখ ২৪ হাজার আবেদন অপেক্ষমাণ থাকার বিষয়টি তাই কেবল একটি প্রশাসনিক পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়, সময়, অর্থ, প্রত্যাশা ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন। একজন ৭৬ বছর বয়সী নাগরিককে যদি নিজের পরিচয়ের ভুল প্রমাণ করতে লাঠিতে ভর করে দপ্তরে যেতে হয়, কিংবা কয়েক দশক আগের নথি খুঁজে এনে পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে বিষয়টির মানবিক দিকও সামনে আসে।

নির্বাচন কমিশনের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে জালিয়াতি ও অনিয়ম ঠেকাতে প্রয়োজনীয় যাচাই অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে প্রকৃত ভুলের শিকার নাগরিকদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা। নিয়ম ও নিরাপত্তা বজায় রেখেই যদি আবেদন নিষ্পত্তির সময় কমানো যায়, অনলাইনে অগ্রগতি জানার সুযোগ বাড়ানো যায় এবং জটিল আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে নাগরিকদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া যায়, তাহলে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে।

এনআইডি একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই এই পরিচয়পত্রে ভুল থাকলে সেটি দ্রুত সংশোধনের সুযোগ পাওয়া নাগরিক সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপেক্ষমাণ এক লাখ ২৪ হাজার আবেদন দ্রুত ও সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা গেলে শুধু একটি প্রশাসনিক চাপ কমবে না, বহু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও স্বস্তি ফিরবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ভুল কম হয় এবং ভুল হলে সহজ ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশোধন করা যায়, সেই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com