প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যবসায়ীদেরকে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান তিনি বুধবার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ এক্সিকিউটিভ বিজনেস গোলটেবিল আলোচনায় দেন। আলোচনা সভার শীর্ষক ছিল ‘অ্যাডভান্সিং রিফর্ম, রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড গ্রোথ’। এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল (US-Bangladesh Business Council, USBBC), যা দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সভায় অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে ড. ইউনূস বলেন, “বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য এখন সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আমাদের অর্থনৈতিক পরিবেশ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, এবং সুশাসন বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক।” তিনি আরও জানান, মার্কিন কোম্পানিগুলো যদি বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগায়, তবে তা শুধু স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ড. ইউনূসের বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো তিনি মেটলাইফ, শেভরন, এক্সেলারেটসহ অন্যান্য শীর্ষ মার্কিন সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশের নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সুযোগের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে এবং উচ্চমার্গের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে। দেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে, এবং আমরা চাই মার্কিন বিনিয়োগকারীরা সেই সুযোগ কাজে লাগাক।”
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের জানান, ড. ইউনূসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসা বাংলাদেশের ছয়জন রাজনৈতিক নেতা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। এই রাজনৈতিক নেতাদেরও মার্কিন শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এতে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। শফিকুল আলম বলেন, “এটি কেবল একটি বিনিয়োগ আহ্বান নয়, এটি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণকে আরও সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টা।”
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশেষ করে শিল্প, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, এবং শক্তি খাতের দ্রুত উন্নয়ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ড. ইউনূস এই সাফল্যকে সামনে রেখেই মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ শুধু একটি বাজার নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র। আমরা চাই মার্কিন কোম্পানিগুলো এখানে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করুক।”
সভায় আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছেন যে ড. ইউনূস শুধু বিনিয়োগের আহ্বান জানাননি, বরং বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে সরকারের যে নীতি, কর সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, সরকার বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে নানা রূপান্তমূলক সংস্কার বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে কর নীতি সহজতর করা, অবকাঠামোগত উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ, এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো।
ড. ইউনূস আরও বলেন, “বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীরা শুধু আর্থিক রিটার্ন পাবেন না, তারা দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে পারবেন। এটি কেবল অর্থনৈতিক মুনাফা নয়, সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ।” তিনি বাংলাদেশের মানবসম্পদ, বিশেষ করে শিক্ষিত যুবক এবং প্রযুক্তি দক্ষ জনশক্তিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
সভায় অংশ নেওয়া মার্কিন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে তাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা সরকারের সংস্কার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং দেশে উন্নয়নমুখী নীতির প্রশংসা করেছেন। একাধিক বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিরা জানান, তারা বাংলাদেশের বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে বিনিয়োগ করার দিকে আরও উৎসাহিত হচ্ছেন।
ড. ইউনূসের এই আহ্বান শুধু ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের জন্য নয়, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী হলেও, সম্প্রতি ব্যবসায়িক বিনিয়োগ আরও ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে এই ধরনের গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের বিনিয়োগকারীদের সরাসরি সংযোগ স্থাপন হয়।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে বাংলাদেশ কেবল বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় না, বরং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা প্রদান করে। তিনি বলেন, “আমরা চাই মার্কিন কোম্পানিগুলো শুধু সংক্ষিপ্তমেয়াদী লাভের জন্য নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলুক। এটি দুই দেশের অর্থনীতির জন্য সমানভাবে লাভজনক হবে।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাত, অবকাঠামো, এবং শক্তি খাতে বড় বিনিয়োগ এসেছে। ড. ইউনূস এই অগ্রগতিকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আমরা দেখেছি যে যেখানে বিনিয়োগকারীরা আস্থা রাখে, সেখানে বাংলাদেশ তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুবিধা প্রদান করতে সক্ষম।”
এছাড়া ড. ইউনূসের আহ্বান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাচ্ছে যে বাংলাদেশ এখন কেবল একটি বাজার নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র, যেখানে ঝুঁকি কম এবং সুযোগ বেশি। তিনি আরও বলেন, “এখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ, এবং পূর্বাভাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। আমরা চাই এই সুযোগগুলো কাজে লাগাক।”
সর্বশেষে, এই গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন দিগন্ত খুঁজে পাচ্ছেন। ড. ইউনূসের আহ্বান এবং সরকারের নীতি বাস্তবায়ন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দেবে।
মোটকথা, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই আহ্বান কেবল মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য নয়, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক সহযোগিতা, এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।