প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ারের মাধ্যমে। শীর্ষস্থানীয় টেক ও লাইফস্টাইল রিটেইলার প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী আলোচিত স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের অনুমোদিত রিসেলার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে বাংলাদেশে বসেই গ্রাহকরা স্টারলিংকের উন্নত ইন্টারনেট সেবা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কিট সরাসরি গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ারের সব আউটলেট ও অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে কিনতে পারবেন।
স্টারলিংক, যা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের উদ্যোগে পরিচালিত, বিশ্বজুড়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সরবরাহে ইতোমধ্যে বিপ্লব ঘটিয়েছে। হাজারো স্যাটেলাইট কক্ষপথে স্থাপন করে এ সেবা এমন সব অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে যেখানে প্রচলিত ব্রডব্যান্ড বা মোবাইল নেটওয়ার্ক কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল কিংবা প্রান্তিক জনপদের মতো জায়গাগুলোতে স্টারলিংক কম লেটেন্সি এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা দিয়ে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশে এ সেবা পৌঁছানোকে অনেকে ডিজিটাল রূপান্তরের বড় একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার তাদের গ্রাহকদের জন্য স্টারলিংকের তিন ধরনের কিট বাজারে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্টারলিংক মিনি কিট, যার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। এটি ভ্রমণপিয়াসী এবং যারা প্রায়ই চলাচল করেন তাদের জন্য বহনযোগ্য সমাধান হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, বাড়িতে ব্যবহারকারী কিংবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য থাকবে স্টারলিংক স্ট্যান্ডার্ড কিট, যার দাম ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। আর যাদের দরকার নিরবচ্ছিন্ন, উচ্চগতি সম্পন্ন এবং অত্যন্ত স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ, বিশেষত কর্পোরেট ব্যবহারকারীদের জন্য থাকছে স্টারলিংক ফ্ল্যাট হাই-পারফরম্যান্স কিট। এর দাম রাখা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে স্টারলিংকের উপস্থিতি ইন্টারনেটের মান ও প্রাপ্যতায় একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মানুষ মোবাইল ডেটার ওপর নির্ভরশীল, যা শহরাঞ্চলে মোটামুটি স্থিতিশীল হলেও গ্রামীণ অঞ্চলে তা প্রায়শই সীমিত। এছাড়া বিদ্যমান ব্রডব্যান্ড সংযোগ অনেক সময় নিরবচ্ছিন্ন থাকে না। এ পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ই-কমার্স, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহকদের জন্য বিশ্বমানের প্রযুক্তি সরাসরি হাতে পৌঁছে দেওয়া। স্টারলিংকের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত সেবা বাংলাদেশে আনার মাধ্যমে তারা শুধু পণ্য বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং দেশব্যাপী একটি উন্নত ডিজিটাল জীবনধারার প্রসারে ভূমিকা রাখতে চায়। এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তিপ্রেমীরা সহজেই গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ারের দোকান বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে কিট কিনে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার শুরু করতে পারবেন।
বাংলাদেশ সরকারও ইতোমধ্যে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ডিজিটালাইজেশনে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশে উচ্চগতির ইন্টারনেট প্রবাহ বাড়ানোর জন্য ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করার নানা উদ্যোগ চলছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফাইবার অপটিক পৌঁছানো সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এ ক্ষেত্রে স্টারলিংককে অনেকেই পরিপূরক সমাধান হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যারা শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে চান বা কৃষি ও ব্যবসায়িক তথ্য প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছেন, তাদের জন্য এটি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকরাও আছেন। তাদের মতে, স্টারলিংক সেবার খরচ এখনো বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। যদিও দাম তুলনামূলকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবু দেশের প্রেক্ষাপটে এটি এখনও বিলাসী খাতে পড়ে। কিন্তু প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ধারণা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লে খরচ আরও কমতে পারে।
এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুতের অস্থিতিশীলতা, ইন্টারনেট কিট রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মতো বিষয়গুলোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার জানিয়েছে, তারা গ্রাহকসেবা ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য আলাদা সাপোর্ট টিম গঠন করেছে, যাতে ব্যবহারকারীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
বাংলাদেশে স্টারলিংকের যাত্রা কেবল প্রযুক্তি জগতে নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে বলে অনেকে মনে করছেন। দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী শিক্ষার্থী কিংবা ডাক্তাররা সহজেই অনলাইনে সংযুক্ত হতে পারবেন। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন বাধাহীনভাবে। একইভাবে, গ্রামীণ উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে পারবেন আরও সহজে।
সব মিলিয়ে স্টারলিংকের অনুমোদিত রিসেলার হিসেবে গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ারের এই পদক্ষেপ শুধু একটি প্রযুক্তিগত বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়, বরং বাংলাদেশে ডিজিটাল বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। এটি হয়তো আগামী দিনে দেশের প্রযুক্তি খাতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।










