সর্বশেষ :
মশার কয়েলের আগুনে পুড়ল গোয়ালঘর, প্রাণ গেল তিন গরুর, দগ্ধ কৃষক গোপালগঞ্জে মহাসড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল যুবকের “রিলিফ নয়, স্থায়ী সমাধান চাই” — তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ কালো তালিকাভুক্তির বিরুদ্ধে আদালতে আলিবাবা, পেন্টাগনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ ব্রাজিলের লক্ষ্য নকআউট নিশ্চিত করা, স্কটল্যান্ডের সামনে ইতিহাস গড়ার সুযোগ সীমান্তে আটক ভারতীয় প্রতিবন্ধী নাগরিক, গ্রহণে অনীহা বিএসএফের চরের ১০ স্কুলে শিক্ষা সংকট, শ্রেণিকক্ষেই মাদকসেবন ও অবৈধ দখলের অভিযোগ নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান জানালেন তথ্য উপদেষ্টা রাজধানীতে অভিযান, ডিএমপির তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি মোশারফ গ্রেফতার ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, বাসের চাপায় প্রাণ গেল যুবকের

শিকদার পরিবারের মুক্তির পরও নাজুক অবস্থায় ন্যাশনাল ব্যাংক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
শিকদার পরিবারের মুক্তির পরও নাজুক অবস্থায় ন্যাশনাল ব্যাংক

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বেসরকারি খাতের প্রাচীন ও প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল ব্যাংক, দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক শিকদার পরিবারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখনো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটে জর্জরিত। শিকদার পরিবার দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ব্যাংকটি মুক্ত হলেও নতুন নেতৃত্বে আসার এক বছরের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য আর্থিক উন্নতি দেখা যায়নি। উল্টো নানা সূচকে ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

নতুন চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্বে আসেন ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু। যদিও তার দায়িত্ব গ্রহণের লক্ষ্য ছিল ব্যাংকের আর্থিক পুনরুদ্ধার, কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। আমানতকারীর আস্থা কমেছে, আমানত উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং খেলাপি ঋণ অতীতের তুলনায় বিপুল হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে ব্যাংকের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বাড়ার ফলে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ক্রমশ নাজুক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের মোট দায়ের ১৭ শতাংশ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে তারল্য হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ন্যাশনাল ব্যাংক এই বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। নিয়মিত জরিমানা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারাবাহিক তহবিল শোধের ব্যর্থতা ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এছাড়া নিট সুদ আয় ঋণাত্মক হওয়ায় ব্যাংক বড় লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে।

২০২৪ সালের ২০ আগস্ট আবদুল আউয়াল মিন্টু ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্ব নেন। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৩৭,৬৩০ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনের শেষে তা কমে ৩২,৬১০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ব্যাংক ৫,০২০ কোটি টাকা নিট আমানত হারিয়েছে। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত হ্রাস পেয়েছে।

ঋণ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল ৪২,৭৪৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ২৩,৭২২ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৫৫.৪৯ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে মোট ঋণ ৪৩,১৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮,৫৮৯ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৬৬.২৪ শতাংশ। মাত্র ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪,৮৬৭ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ৩৮৮ কোটি টাকা। এ থেকে স্পষ্ট যে, ব্যাংকের ঋণ অব্যবস্থাপনা ক্রমবর্ধমান এবং নগদ আদায়ের অবস্থাও নাজুক। গত ৯ মাসে ব্যাংক মাত্র ২৪১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকের আরেকটি বড় সমস্যা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১৬,৮৫৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে ২২,৬৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র ৯ মাসে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৫,৭৭৬ কোটি টাকা। মূলধন ঘাটতিও বেড়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের ঘাটতি ছিল ৫,৬৪৫ কোটি টাকা, যা জুন ২০২৫ পর্যন্ত ৮,৪৬০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ব্যাংকের সিএআরআর ও এসএলআর সংক্রান্ত নিয়মও অমান্য হচ্ছে। বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে মোট তলবি ও মেয়াদি দায়ের চার শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা রাখতে হয়। এছাড়া সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ বা এসএলআর হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ রাখতে হয়। তবে ন্যাশনাল ব্যাংকের উদ্বৃত্ত সিকিউরিটিজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে এসএলআর ঘাটতিতে রয়েছে। ২৫ জুন পর্যন্ত এসএলআর ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,০১০ কোটি টাকা। সিআরআর ঘাটতিও বেড়ে ১,২৫২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

সুদ আয় পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ব্যাংকের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক দাঁড়িয়েছে ৪,৮৩৩ কোটি টাকা। এর ফলে ব্যাংক ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৯৯১ কোটি টাকার লোকসান করেছে, যা গত বছরের সমান সময়ে ৬৫২ কোটি টাকা ছিল। পুরো ২০২৪ সালে ব্যাংকের লোকসান ছিল ১,৭২২ কোটি টাকা। নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জামানত ছাড়া ৬,০০০ কোটি টাকা ধার নেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ব্যাংক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টিতে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার গ্রহণ করা হয়েছে। এই ঋণের মেয়াদ কয়েকবার বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও ব্যাংক পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি হিসাব অনুযায়ী ২,৩৭০ কোটি টাকার ঋণও সময়মতো শোধ করা সম্ভব হয়নি। মোট ৯,৩৫৫ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার গ্রহণ করেছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি বক্তব্য দেননি। হোয়াটঅ্যাপে বিস্তারিত মেসেজ পাঠানোর পরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, শিকদার পরিবারের মুক্তির পরেও ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি, আমানতের হ্রাস এবং নিয়মিত সিএআরআর ও এসএলআর অমান্য ব্যাংকের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকের পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি পদক্ষেপ এবং কার্যকর তত্ত্বাবধান ছাড়া পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত