প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে ভোক্তাদের জন্য এসেছে নতুন স্বস্তির খবর। অক্টোবর মাসের জন্য তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও অটোগ্যাসের দাম আবারও কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) বিইআরসি এই নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে জানায়, সন্ধ্যা ৬টা থেকেই নতুন দাম কার্যকর হবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, অক্টোবর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৯ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ২৭০ টাকা থেকে ১ হাজার ২৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের মাসের তুলনায় এই দামে ভোক্তারা সামান্য হলেও আর্থিক স্বস্তি পাবেন।
কমিশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের দাম পরিবর্তনের প্রভাবেই এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌদি আরামকোর ঘোষিত সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে প্রতি মেট্রিক টন প্রোপেনের দাম ধরা হয়েছে ৪৯৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেনের ৪৭৫ মার্কিন ডলার। প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ হিসেবে গড়ে ৪৮২ মার্কিন ডলার প্রতি মেট্রিক টনে ধরা হয়েছে, যা দেশীয় বাজারে এলপিজি ও অটোগ্যাসের খুচরা দামে প্রভাব ফেলেছে।
এর ফলে বেসরকারি এলপিজি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও এই নতুন মূল্যহার অনুযায়ী দাম সমন্বয় করবে। দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত প্রায় ৯৮ শতাংশ এলপিজি বেসরকারি খাত থেকে আসে, যা আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে, সৌদি আরবের সিপি-ভিত্তিক মূল্য পরিবর্তন সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে প্রতিফলিত হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বরও এক দফা সমন্বয় করেছিল বিইআরসি। সে সময় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ২৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, টানা দুই মাস ধরে ভোক্তারা এলপিজির দামে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।
একইসঙ্গে মঙ্গলবার অটোগ্যাসের দামও কমানোর ঘোষণা দেয় বিইআরসি। অক্টোবর মাসে অটোগ্যাসের মূসকসহ খুচরা দাম প্রতি লিটার ১ টাকা ৩৮ পয়সা কমিয়ে ৫৬ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ আগের মাসে দাম কমানো হয়েছিল মাত্র ১৩ পয়সা।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ১১ দফায় এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম পরিবর্তন করা হয়েছিল— যার মধ্যে চার দফায় দাম কমানো হয়েছিল এবং সাত দফায় বাড়ানো হয়। দাম কমানো হয়েছিল এপ্রিল, মে, জুন ও নভেম্বর মাসে, আর বাড়ানো হয়েছিল জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে। ডিসেম্বর মাসে দাম ছিল অপরিবর্তিত।
বাংলাদেশে এলপিজির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। নগর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় রান্নাবান্নার জ্বালানি হিসেবে এটি এখন অন্যতম প্রধান উপকরণে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস সংযোগহীন এলাকাগুলোতে এলপিজির ওপর নির্ভরশীলতা দিন দিন বাড়ছে। তাই দাম বাড়া বা কমার বিষয়টি সরাসরি ভোক্তার জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় দেশে এই দাম কমানো সম্ভব হয়েছে। তারা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে প্রোপেন-বিউটেনের সরবরাহ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী মাসগুলোতেও দাম স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে ডলার বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন ভবিষ্যতের মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “আমরা প্রতি মাসেই সৌদি আরামকোর ঘোষিত আন্তর্জাতিক দাম বিবেচনা করে এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম নির্ধারণ করি। এই প্রক্রিয়া ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০টিরও বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজি সরবরাহ করছে। এদের মধ্যে শীর্ষ কয়েকটি কোম্পানি মাসিক ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুসারে দাম সমন্বয় করে থাকে। সরকার নির্ধারিত এই দাম অনুসরণে তারা বাধ্য।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দাম কমানো ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও দেশের সাধারণ মানুষ যাতে বাস্তবে এই দামের সুফল পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ খুচরা পর্যায়ে অনেক সময় ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। এজন্য বিইআরসি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এছাড়া পরিবহন খাতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম কমে যাওয়ায় যাত্রীবাহী যানবাহনের খরচেও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও পরিবহন মালিকদের একটি অংশ বলছে, কেবল অটোগ্যাসের দামে এই সামান্য হ্রাস ভাড়ায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনার মতো নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, সাধারণ ভোক্তারা এই দাম হ্রাসকে স্বাগত জানিয়েছেন। রাজধানীর মিরপুরের এক গৃহিণী বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে গ্যাসের দাম এত বেড়েছিল যে রান্নার খরচ বেড়ে যাচ্ছিল। এখন দাম কিছুটা কমায় একটু স্বস্তি লাগছে।”
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এলপিজি বাজারে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর নির্ভরতা কমাতে না পারলে দেশীয় বাজার সবসময়ই ঝুঁকিতে থাকবে।
তারা আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২৪ সালে যখন দাম বেড়েছিল, তখন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত বিপাকে পড়েছিলেন। তাই দাম কমানো একটি স্বস্তির সংবাদ হলেও এটি টেকসই হতে হলে নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
অক্টোবর মাসে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছে বিইআরসি। তারা জানায়, দেশের সব বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন ভোক্তাদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করা হয়।
সর্বোপরি, দাম কমানোর এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য এটি সামান্য হলেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এখন প্রয়োজন, ঘোষিত এই দামের সুফল যেন কোনোভাবেই বাজারে বিকৃত না হয়— সেটি নিশ্চিত করা।