চীনের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে উদ্বিগ্ন ভারত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
চীনের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারে উদ্বিগ্ন ভারত: দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যা ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন এক শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানিয়েছে, ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে বেইজিংয়ের সক্রিয় উপস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য এখন কৌশলগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ছাত্র আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশে চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ১৪ মাসে চীনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অন্তত সাতটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকগুলোতে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো প্রধান আলোচ্য হিসেবে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানে এই সময়ের মধ্যে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত ২২টি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ঘনিষ্ঠতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা কাঠামোতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনে চীন এখন ভারতের চারপাশে এক ধরনের “কূটনৈতিক বৃত্ত” তৈরি করছে। এই তৎপরতার মাধ্যমে বেইজিং একদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করছে, অন্যদিকে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করছে।

স্টিমসন সেন্টারের চীন ও দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল মার্কি পত্রিকাটিকে বলেন, “চীন ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোকে কৌশলগতভাবে নিজেদের অংশ হিসেবে দেখে। ভারত যেমন বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কাকে নিজের ‘প্রাকৃতিক প্রভাব বলয়’ হিসেবে মনে করে, চীনও একইভাবে তাদের প্রভাবের আওতায় আনতে চায়।”

নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে এই প্রবণতা একটি দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের বাস্তব রূপ। ভারতের নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক বন্ধন এখন চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের চাপে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক ড. অমিত রঞ্জন বলেন, “ভারত বর্তমানে ভূরাজনৈতিকভাবে এক কঠিন সময় পার করছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক মন্থরতা এবং সীমান্ত উত্তেজনার কারণে নয়াদিল্লি এখন আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই। চীন এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে চাইছে।”

রঞ্জনের মতে, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তুলনামূলক ভালো—শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভুটান। কিন্তু এখানেও চীনের প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় হ্যামবানটোটার বন্দর চীনা নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন। মালদ্বীপেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। এমনকি ভুটান, যেটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র, সেখানেও চীন সীমান্তে কার্যক্রম বাড়িয়েছে।

রঞ্জন আরও বলেন, “চীনের কূটনৈতিক কৌশলের সবচেয়ে গভীর এবং উদ্বেগজনক দিক হলো বাংলাদেশে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন সরকারের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক দিন দিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এটি নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।”

ভারতের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান। এই রাজ্যগুলো ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোরের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত। নয়াদিল্লি আশঙ্কা করছে, বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা বাড়লে এই অঞ্চলে সীমান্ত উত্তেজনা বা ভূরাজনৈতিক চাপের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মার্চ মাসে বেইজিং সফরের সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘স্থলবেষ্টিত’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, “এই অঞ্চল সমুদ্রবন্দরে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল।” ইউনূসের এই বক্তব্য নয়াদিল্লিতে কূটনৈতিক অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ভৌগোলিক সত্য নয়—বরং এটি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে চীনের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে তুলে ধরে।

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়া এখন নতুন বাণিজ্য ও নিরাপত্তা জোটের পরীক্ষাগার। বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)’ প্রকল্প ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় গভীরভাবে প্রবেশ করেছে, আর এখন বাংলাদেশেও তার প্রভাব বিস্তারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ঢাকা-চীন অর্থনৈতিক করিডোর, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

অন্যদিকে, নয়াদিল্লি মনে করছে, ইউনূস প্রশাসন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে, যা ভারতের নিরাপত্তা কৌশলের জন্য উদ্বেগের কারণ। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন হলে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

চীনের এই আঞ্চলিক তৎপরতার পেছনে শুধু অর্থনীতি নয়, বরং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক অভিলাষ কাজ করছে। বেইজিং এখন এমন এক কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামোগত সহায়তার বিনিময়ে কূটনৈতিক আনুগত্য আদায় করা হচ্ছে। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাববলয় ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

ভারতের বিশ্লেষক মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—নয়াদিল্লি কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বৈদেশিক নীতি কিছুটা পশ্চিমমুখী হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’কে ঘিরে। কিন্তু ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ভারতের এই পশ্চিম-নির্ভর নীতি তার প্রতিবেশী কূটনীতিকে দুর্বল করেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ধীরে ধীরে তার স্থান দখল করছে।”

এখন প্রশ্ন হলো, চীনের এই কূটনৈতিক আগ্রাসনের জবাবে ভারত কী করবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতকে এখন তার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি পুনর্গঠন করতে হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার না করলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো চীনের প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকবে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনের প্রভাব শুধু রাজনৈতিক নয়—এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। চীনের বিনিয়োগ, ঋণ সহায়তা ও দ্রুত অবকাঠামো বাস্তবায়ন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এর বিপরীতে ভারতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ধীর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে হ্রাস করছে।

এ অবস্থায় নয়াদিল্লি এখন কূটনৈতিকভাবে এক দ্বিধায় পড়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মোকাবিলায় আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা জরুরি।

ফিনান্সিয়াল টাইমস তাদের প্রতিবেদনের শেষে মন্তব্য করেছে, “দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—এটি এখন বাস্তবতা। ভারত যদি এখনই তার প্রতিবেশী কূটনীতিতে নতুন গতি না আনে, তবে এই অঞ্চল একদিন পুরোপুরি চীনের প্রভাব বলয়ে চলে যেতে পারে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ভারত নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে তাই এখন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে চীনের বিনিয়োগ ও ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক—দুটিরই সদ্ব্যবহার সম্ভব হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে চীনের নীরব কিন্তু শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপ এখন পুরো অঞ্চলের জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। প্রশ্ন শুধু ভারতের নয়—এখন পুরো অঞ্চলের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ, কীভাবে চীনের এই কৌশলগত প্রভাব মোকাবিলা করা যায় এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত