প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও ফুটপাত এক আইনশৃঙ্খলা ও জনস্বার্থভিত্তিক অভিযানের পর অচিরেই বদলে গেছে। রবিবার থেকে চৌহাট্টা, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, লামাবাজার, আম্বরখানা ও তালতলা এলাকায় যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাথা উঁচু করে বসে ছিল শত শত ভ্রাম্যমাণ হকার, সেখানে এখন নীরব শৃঙ্খলা ও খালি ফুটপাত দেখা যাচ্ছে। গত কয়েকদিনে নগরবাসীর মুখে স্বস্তির অভিব্যক্তি, আমদের সঙ্গে কথা বলার সময় তারা সবাই চেয়েছেন — এবার এই স্থিতি টিকে থাকবে কি না।
হকারদের সরিয়ে নেওয়া ভাবনা এ শহরে নতুন নয়। পূর্বেকারের দুই মেয়র—আরিফুল হক চৌধুরী ও মো. আনোয়ারুজ্জামান—দুই আলাদা সময়ে একই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথম দিকে সড়ক-ফুটপাত মুক্ত হয়, তবে কিছুদিনের মধ্যেই পুনরায় পুরোনো চিত্র ফিরে আসে। রুটিন উচ্ছেদের পর হকাররা আবারও জায়গা দখল করে ফেলা, প্রশাসনের অননুমিত মানসিকতা বা তৎপরতার অভাব—এসব কারণেই প্রথম প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে জনমত মনে করে। এই ইতিহাস নগরবাসীর মাঝে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা রেখে গিয়েছে; তাই এবারের অভিযান শুরু হতেই তারা বলছেন—“এবার ভিন্ন হতে হবে।”
আসলে এইবার কিছুটি আলাদা। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও মহানগর পুলিশ মিলিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলম ১৯ অক্টোবর থেকে শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাতে হকার বসানো বন্ধের নির্দেশ দেন এবং রবিবার থেকে তা অনুশীলনে পরিবর্তিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের সদস্য এবং সিসিকের দায়িত্বশীলরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। রবিবার সন্ধ্যায় জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে বন্দরবাজার মধুবন সুপার মার্কেট পর্যন্ত তিন কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে পদচারণা করেন এবং হকারদের লালদিঘির পাড়ে নতুন অস্থায়ী শেডে পুনর্বাসনের নির্দেশ কার্যকর করা হয়।
হকারদের জন্য লালদিঘির পাড় মাঠে নির্মাণ করা অস্থায়ী বাজারটি নজরে পড়ে। এখানে দশটি গলি করে ইট-বাঁশ-ত্রিপল দিয়ে ঘিরে অস্থায়ী শেড বানানো হয়েছে। নতুন রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, বাজারস্থলে টয়লেটসহ বেসিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে এবং তিনটি প্রবেশপথে আঞ্চলিক চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে। সিসিকের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং ও পুলিশিংয়ের বন্দোবস্ত করার কথা বলা হয়েছে; ব্যবসায়ীদের সুবিধার স্বার্থে আর সেখানে কোনো ভাড়া নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে প্রশাসন। সিসিকের নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা-ই রাফিন সরকার জানান, “এই অস্থায়ী বাজার হকারদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় সরবরাহ করবে এবং একইসঙ্গে শহরের যানজট নিরসনেও সহায়তা করবে।”
নগরবাসীর প্রতিক্রিয়া মিশ্র। জল্লারপাড়ের বাসিন্দা হুমায়ুন আহমেদ বলেন, “আগে একই দৃশ্য বহুবার দেখেছি—প্রাথমিক উচ্ছেদ হলে হকাররা সরে যায়, পরে ফিরে আসে। এবার যদি প্রশাসন দৃঢ়তা দেখায় এবং রাজনৈতিক চাপ বা লোকাল ভরসা কাজ না দেয়, তাহলে অন্তত দুই মাস চালিয়ে যেতে হবে। এক সপ্তাহে কাজ হবে না।” অন্য একজন ডিউক স্ট্রারলিন বলেন, “রাস্তা যখন খালি দেখছি, হাঁটা সহজ লেগেছে; কিন্তু কয়েক স্থানে দেখলাম সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল পার্কিং করে নেয়া হচ্ছে—এতে আবার সমস্যা হবে।”
পুলিশ প্রশাসন এই উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীল। মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম স্পষ্ট করে বলেছেন, “হাট-বাজার বা ফুটপাত দখলে রাখা হলে তা আর সহ্য করা হবে না। সিএনজি ও লেগুনাদের অননুমানিক পার্কিং কিংবা অবৈধ স্ট্যান্ড স্থাপনের বিষয়গুলো আমাদের নজরে রয়েছে। আমরা তিন ধাপে নতুন নির্দেশনা জারি করেছি যাতে পরিবহন ব্যবস্থা শৃঙ্খলিত হয়।” তিনি বলেন, অপ্রীতিকর চলমান প্রক্রিয়া থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পার্কিং স্থান নির্দিষ্টভাবে পুনর্বিন্যস্ত করা হবে। জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমও বলেন, “হকাররা নির্দেশ মানায়; সিসিককে ধন্যবাদ আমাদের সরাসরি হস্তক্ষেপের জন্য। যদি কেউ রাস্তায় বিধি লঙ্ঘন করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে বাস্তব পর্যালোচনায় রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, এই ধরনের পুনর্বাসন স্থায়ী পর্যায়ে গেলে চলতি জীবিকা-চাহিদা মেটাতে হকারদের আয়-রুটিনে পরিবর্তন আসবে। অনেকে ছোট মুদি, সবজি, বা মোবাইল ব্যবসার ওপর নির্ভর করে; হঠাৎ বাজার বদল তাদের ক্রেতা-সংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক একনিষ্ঠতা ও অজানা রাজনৈতিক প্রভাব—যা পুরোনো অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়—এসব কাটিয়ে উঠতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ধারাবাহিকভাবে চালাতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক সার্বিক সমাধানের জন্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সমিতির সহযোগিতা জরুরি।
হকারদের স্বাভাবিক জীবিকা রক্ষার দাবি খাটে—এটাই তাদের মানবিক অধিকার। সিসিক জানিয়েছে প্রথম পর্যায়ে কোনো ভাড়া নেওয়া হবে না, যাতে তারা সময়মতো স্থির হতে পারে। প্রশাসন বলছে, বাজার মনিটরিং ও সামাজিক সচেতনতা প্রচার অব্যাহত থাকবে; মাইকিং ও স্থানীয় সভার মাধ্যমে হকারদের নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করা হবে যাতে তারা নির্ধারিত স্থানে গিয়ে বসেন এবং শহরের সড়ক-ফুটপাত মুক্ত থাকে।
বিশ্লেষকরা মনে করান, সফলতা তখনই টিকে থাকবে যখন প্রশাসন শুধু একদিনের অভিযান নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে তদারকি, বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা, এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে। নগর পরিকল্পনাকারীরা বলছেন, ফুটপাত-হকার বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলা নয়; এটিকে সামাজিক নীতির আওতায় এনেই দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতে হবে—যাতে স্থানীয় সুবিধাভোগী ও নগরবাসীর স্বার্থ দুটোই রক্ষা পায়।
নগরবাসীর প্রত্যাশা স্পষ্ট: স্বচ্ছ, অদলবদলহীন, ও ধারাবাহিক প্রশাসন চাই। যদি জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সিটি করপোরেশন একই রূপরেখায় কাজ করে স্থায়ীভাবে নজরদারি বজায় রাখে—বিশেষত নির্বাচনী বা রাজনৈতিক চাপের সময়—তাহলে এই হকারমুক্ত নগরী টিকানো সম্ভব। আর যদি আবারও রাজনীতি, অনিয়ম বা দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে উদ্যোগ থেমে যায়, তবে পুনরায় পুরোনো পরিস্থিতিই ফিরে আসবে—ফুটপাত-রাস্তাঘাট দখল করে হকারদের ভিড়।
সিলেটের বাসিন্দারা এখন অনুরোধ করছেন—এবারি সূচনার পেছনে ফেলছে না; প্রশাসনকে দৃঢ়তা ও জনমতের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করে এই শুদ্ধিকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। নগরীর রাস্তাঘাটের যে স্বস্তি এসেছে, সেটি এখনও ভঙ্গুর; কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও অবিচল প্রয়াস থাকলে এটি স্থায়ী রূপ নিতে পারে এবং সিলেট নগরীর জনজীবন হবে আরও সুচারু ও আরামদায়ক।