প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল এবং ইবনে সিনা হাসপাতালের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আর্থিক মালিকানার সম্পর্ক নেই বলে স্পষ্ট করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
মঙ্গলবার সকালে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “বিএনপির করা মন্তব্য আমাদের জন্য দুঃখজনক এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা কিংবা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতের কোনো মালিকানাগত সম্পর্ক নেই। বিএনপি ইচ্ছাকৃতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করতে চাইছে।”
বিএনপির সাম্প্রতিক ৩৬ দফা প্রস্তাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার হিসেবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীদের নিয়োগ দেওয়া যাবে না যেগুলোকে সর্বমহলে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবাধীন হিসেবে দেখা হয়। তাদের প্রস্তাবে ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল এবং ইবনে সিনা ট্রাস্টের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে জামায়াত নেতারা অভিযোগ করেন, বিএনপির এই অবস্থান “অযৌক্তিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছি—এই ধরনের প্রস্তাব কেবল বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্যই দেওয়া হয়েছে। বিএনপিও অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে; কিন্তু আমরা কখনো তাদের বিষয়ে এমন কোনো অভিযোগ তুলি নাই।”
তিনি আরও বলেন, “জামায়াত একটি আইনসম্মত রাজনৈতিক দল। আমরা চাই, নির্বাচন কমিশন সকল দলের সঙ্গে সমান আচরণ করুক এবং এমন প্রস্তাব যেন নির্বাচনের পরিবেশকে বিভক্ত না করে।”
নির্বাচন কমিশনের সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবারের বৈঠকে বিএনপি ও জামায়াতের প্রস্তাব নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। কমিশন উভয় দলের বক্তব্য শুনে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সব পক্ষের পরামর্শ পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছে। কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, “বিএনপির প্রস্তাবে উল্লিখিত কিছু প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হবে। তবে কমিশন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে।”
এর আগে গত ২৩ অক্টোবর বিএনপি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে যে ৩৬ দফার প্রস্তাব পেশ করে, তাতে নির্বাচনি প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ, সেনা মোতায়েন, ইভিএম বাতিল, এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রস্তাবনার ষষ্ঠ দফায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, “দলীয় বা বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মচারীদের ভোটের কাজে নিয়োগ দিলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
বিএনপির এই প্রস্তাবের জবাবে জামায়াতও পাল্টা ১৮ দফা প্রস্তাব জমা দেয় নির্বাচন কমিশনে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না থাকা, সব দলের সমান প্রচার অধিকার নিশ্চিত করা, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা, এবং ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য না করা।
বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনের এক মুখপাত্র বলেন, “দুই দলের প্রস্তাবই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। কমিশন কোনো প্রস্তাবকেই রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে খারিজ করবে না। সব পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক বা ইবনে সিনা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতেও এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো ও ধর্মভিত্তিক পরিচিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নজরদারি আরোপ করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রতিবেদন ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ায়ও এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কাঠামো স্বচ্ছ রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
জামায়াতের দাবি, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বা ইবনে সিনা ট্রাস্টের মালিকানা কাঠামো সম্পূর্ণ বেসরকারি ও শেয়ারভিত্তিক, যেখানে দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ জনগণের অংশীদারিত্ব রয়েছে। তারা বলছে, “দলীয় বা সংগঠনের নামে কোনো শেয়ার মালিকানা বা বোর্ড সদস্যপদ নেই।”
অন্যদিকে, বিএনপি বলছে, অতীতের প্রভাব ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পুরোপুরি মুছে যায়নি। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক অর্থায়ন বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সমাজে বিদ্যমান, যা নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক সামনে আসা আসন্ন ভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষত যখন কমিশন একাধিক দলের অংশগ্রহণে একটি ঐকমত্যভিত্তিক নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এ ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা দাবি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
একজন সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, কমিশন যেন এসব অভিযোগের বাস্তবতা যাচাই করে। যদি দেখা যায় কোনো প্রতিষ্ঠান সত্যিই কোনো রাজনৈতিক দলের অর্থনৈতিক প্রভাবে আছে, তাহলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি তা কেবল রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হয়, তাহলে তা পরিহার করা উচিত।”
জামায়াতের পক্ষ থেকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে, তারা এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চায় না; বরং নির্বাচন কমিশনের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা চাই এই নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক মাইলফলক হোক। তাই অযথা অভিযোগ নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ইসলামী ব্যাংক বা ইবনে সিনার সঙ্গে আমাদের দলের নাম জড়ানো বন্ধ হোক। আমরা বিশ্বাস করি, স্বচ্ছ তদন্ত হলে সত্য প্রকাশ পাবে এবং জনগণ বুঝবে—এগুলো কেবল রাজনৈতিক কৌশল।”
দেশের আর্থিক ও স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনা বহু বছর ধরে ব্যবসায়িকভাবে সক্রিয়। এদের সেবার পরিধি ও আর্থিক ভূমিকা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব প্রশাসন বলছে, তারা সর্বদা বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে পরিচালিত হয় এবং কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাবমুক্তভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
পরিস্থিতি এখনো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আরও বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে এই বিতর্কের অবসান ঘটবে, যাতে নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে কোনো বিভাজন সৃষ্টি না হয় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়।