রাতে সাময়িক বন্ধের পর চলছে মেট্রোরেল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪২ বার
রাতে সাময়িক বন্ধের পর চলছে মেট্রোরেল

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত স্বপ্নের প্রকল্প মেট্রোরেল আবারও স্বাভাবিক গতিতে চলছে। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) সকাল থেকে নিয়মিতভাবে ট্রেন চলাচল করতে দেখা গেছে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত সম্পূর্ণ রুটে। কয়েক ঘণ্টার সাময়িক বন্ধের পর আবারও ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

এর আগে বুধবার রাতে আগারগাঁও থেকে শাহবাগ অংশে হঠাৎ করেই মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানায়, ফার্মগেট এলাকায় ট্র্যাকের একাংশে হালকা কম্পন ও যান্ত্রিক গোলযোগ শনাক্ত হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়। রাত সোয়া নয়টার দিকে এ স্থগিতাদেশ কার্যকর হয় এবং তা রাতভর মেরামতের পর তুলে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফার্মগেটের যে অংশে কয়েক দিন আগে বিয়ারিং প্যাড পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, সেই স্থানে কিছুটা অস্বাভাবিক কম্পন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। প্রকৌশলীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ট্রেন চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। পরে রাতেই বিশেষজ্ঞ দল মেরামত কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং বৃহস্পতিবার ভোরে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু করা হয়।

এদিকে মেট্রোরেল বন্ধের খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। আগারগাঁও, বিজয় সরণি ও ফার্মগেট স্টেশনে অনেক যাত্রী অপেক্ষায় থাকলেও ট্রেন না আসায় অনেকেই বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করেন। তবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যায়, সব স্টেশনে নিয়মিত যাত্রীসেবা চালু হয় এবং যাত্রীদের মধ্যে ছিল স্বস্তির আমেজ।

ফার্মগেট এলাকায় দুর্ঘটনার পর থেকে রাজধানীবাসীর মধ্যে মেট্রোরেলের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বিয়ারিং প্যাড পড়ে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাটি সাধারণ মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। গত রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফার্মগেট স্টেশনের পশ্চিম পাশে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে নিচে পড়ে গেলে আবুল কালাম নামের এক যুবক নিহত হন। ঘটনার পরপরই মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে এলাকাটি বন্ধ করে দেয় এবং প্রয়োজনীয় মেরামতের কাজ সম্পন্ন করে।

পরদিন সোমবার বেলা ১১টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলের মেরামত শেষ করে মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক ঘোষণা করা হয়। তবে পরবর্তী তিন দিন ফার্মগেট এলাকায় ট্রেনগুলো সতর্কভাবে ও ধীরগতিতে চলাচল করে। প্রকৌশলীদের একাধিক দল নিয়মিতভাবে ওই অংশ পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রতিটি ট্রেনের গতি ও ট্র্যাকের অবস্থা পরীক্ষা করে। তবু বুধবার রাতে নতুন করে কম্পন দেখা দিলে আবারও কর্তৃপক্ষকে ট্রেন বন্ধ রাখতে হয়।

ডিএমটিসিএল-এর এক কর্মকর্তা জানান, “মেট্রোরেল একটি অত্যাধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা। যেকোনো সামান্য যান্ত্রিক সমস্যা বা কম্পন শনাক্ত হলেই আমরা নিরাপত্তার স্বার্থে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। এটি দুর্ঘটনা এড়ানোর অংশ হিসেবেই দেখা উচিত, কোনো আতঙ্কের বিষয় নয়।”

তিনি আরও বলেন, “ফার্মগেট এলাকায় যান্ত্রিক কম্পন শনাক্ত হওয়ার পরই আমরা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুরো ট্র্যাক পরিদর্শন করিয়েছি। মেরামত ও পুনঃস্থাপনের পর আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে ট্রেন চলাচলে আর কোনো ঝুঁকি নেই। আজ সকাল থেকে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।”

রাজধানীর যাত্রী সাধারণও বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকে কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। মতিঝিল থেকে আগারগাঁওগামী এক যাত্রী বলেন, “আগে থেকে জানানো থাকলে ভালো হতো, হঠাৎ বন্ধের কারণে কিছুটা ভোগান্তি হয়েছে। তবে নিরাপত্তার জন্য ট্রেন বন্ধ রাখা হলে সেটা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আজ সকালে ট্রেনে উঠে মনে হচ্ছে, আগের মতোই সবকিছু ঠিক আছে।”

আরেক যাত্রী, যিনি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার জন্য মেট্রোরেল ব্যবহার করেন, বলেন, “আমি ফার্মগেট স্টেশনে উঠি। দুর্ঘটনার পর থেকে কিছুটা ভয় ছিল, কিন্তু এখন ট্রেন ঠিকভাবে চলছে দেখে স্বস্তি লাগছে। আশা করি ভবিষ্যতে কর্তৃপক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ আরও জোরদার করবে।”

প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বিয়ারিং প্যাড হলো মেট্রোরেলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা রেললাইন ও উড়ালপথের সংযোগ স্থলে ভারসাম্য রক্ষা করে। এই অংশে সামান্য ত্রুটি ঘটলেও ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। এজন্য প্রতিদিনই নির্দিষ্ট সময় অন্তর মেট্রোরেলের বিভিন্ন অংশে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করা হয়।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, মেট্রোরেল চালুর পর থেকেই কেন বারবার এমন যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রকল্প হিসেবে শুরুতে কিছু যান্ত্রিক বা কাঠামোগত সমস্যা দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এসব সমস্যা ধীরে ধীরে সমাধান হয়ে গেলে পুরো ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা আরও বেড়ে যাবে।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনজুর হোসেন বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা চাই, জনগণ মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও মান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকুক। যেকোনো সামান্য ইস্যুকেও আমরা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করি। প্রতিদিনই আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ দল কাজ করে, যেন কোনো ঝুঁকি না থাকে।”

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে যাত্রীদের সুবিধার জন্য ট্র্যাক পর্যবেক্ষণে উন্নতমানের সেন্সর ও মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে যেকোনো সমস্যা ঘটার আগেই তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

সবশেষে রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা, মেট্রোরেল যেন নিয়মিত ও নিরাপদভাবে চলতে পারে, যাতে নগর জীবনে দ্রুত ও আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত হয়। কারণ এই প্রকল্প শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি ঢাকার মানুষের স্বপ্ন, সময় ও আধুনিকতার প্রতীক। দুর্ঘটনা বা সাময়িক বিপত্তির পরও তাই মেট্রোরেলের প্রতি নাগরিকদের আস্থা অটুট রয়েছে।

রাজধানীর কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, এমনকি বয়স্ক যাত্রীদের কাছেও মেট্রোরেল এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার সকালে পুনরায় ট্রেন চলতে দেখা যাওয়ার পর অনেকেই বলেছেন, “ঢাকার সকাল আবারও স্বাভাবিক হয়েছে—মেট্রোরেল চলছে, শহর চলছে, জীবনও চলছে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত