‘ঐকমত্য নয়, বিভাজন বাড়িয়েছে সরকার’ — জাতীয় প্রেসক্লাবে ফখরুলের বক্তব্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
বিএনপি মুক্ত স্বাধীনচেতা গণতান্ত্রিক শক্তি: ফখরুল

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার ও ঐকমত্য কমিশন। শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই অভিযোগ করেন।

সভায় মির্জা ফখরুল বলেন, “বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এটি তৈরি করেছে বর্তমান সরকার। তারা যে কমিশন গঠন করেছে, সেখানে দীর্ঘ আট-নয় মাস ধরে নানা আলোচনা হয়েছে ঐকমত্যের নামে। কিন্তু বাস্তবে ঐকমত্য তৈরি হয়নি, বরং দেশে নতুন বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।”

বিএনপির মহাসচিব দাবি করেন, সরকার কমিশন গঠনের মাধ্যমে কৃত্রিম ঐকমত্য দেখানোর চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, “এই কমিশনে অনেক ভিন্নমত ছিল। কয়েকটি বিষয়ে আমরা একমত হতে পারিনি। অথচ সেই ভিন্নমতগুলোকে সরকার উপেক্ষা করেছে এবং সেগুলোকে ঐকমত্য হিসেবে প্রচার করেছে, যা আসলে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।”

তিনি ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বলেন, “স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক পার্থক্য রয়েছে। নোট অব ডিসেন্ট না রেখে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এটি ছিল সরকারের একপক্ষীয় উদ্যোগ।”

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, “নির্বাচন বানচাল করতে একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো গণভোটের সুযোগ নেই। সংবিধানে এর কোনো স্থানও নেই। গণভোটের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।”

তবে তিনি পরিষ্কার করেন, বিএনপি নির্বাচন বর্জনের পথে নয়। “আমরা নির্বাচনে অংশ নেব,” বলেন ফখরুল। “আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় উত্থাপিত বিষয়গুলো আমরা স্থান দেব। জনগণ আমাদের ভোট দিলে এবং সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সেই সংস্কারগুলো পার্লামেন্টে পাস করে বাস্তবায়ন করব।”

তিনি আরও যোগ করেন, “দেশে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক চাপ বা ক্ষমতার অপব্যবহার দিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাধান আসবে না। পরিবর্তন আসবে জনগণের ভোট ও মতামতের মাধ্যমে।”

বিএনপি মহাসচিব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রসঙ্গে বলেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ এমন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া উচিত, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐক্যও থাকবে।”

তিনি বলেন, “আজ যারা ঐকমত্য কমিশনের নামে ভিন্নমত দমন করছে, তারা ইতিহাসের আসামি হয়ে থাকবে। দেশের মানুষ খুব সচেতন, তারা জানে কারা গণতন্ত্রের পক্ষে, আর কারা ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায়।”

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “ঐকমত্য কমিশন যদি সত্যিকার অর্থে জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন ঘটাত, তাহলে আজ দেশের এই বিভাজন দেখা দিত না। এখন জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই রাজনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।”

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের নামে বর্তমানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি চলছে। জনগণকে এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের ঐক্য জরুরি।”

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুল হক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহফুজুল করিমও বক্তব্য রাখেন। বক্তারা বলেন, কাগজে-কলমে সংস্কারের চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপই এখন দেশের প্রয়োজন।

জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সভায় সকাল থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বক্তাদের বক্তব্যের সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা করতালিতে সভাস্থল মুখর করে তোলেন।

সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা কোনো সংঘাত চাই না, বরং একটি সমাধান চাই—যেখানে জনগণের মতামতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সংলাপ ও নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব।”

তিনি বলেন, “গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলেরও দায়িত্ব আছে। আমরা চাই জনগণের আস্থা ফিরে আসুক, রাজনৈতিক পরিবেশ হোক অংশগ্রহণমূলক।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য বিএনপির নীতিগত অবস্থানের একটি পুনঃনিশ্চিত ঘোষণা। এর মাধ্যমে দলটি স্পষ্ট করেছে যে তারা অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থার বর্তমান রূপে সন্তুষ্ট নয়, তবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবস্থান বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের অংশ, যা ভোটারদের কাছে “গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি”র বার্তা দিতে চায়।

সভা শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও দেশের বর্তমান রাজনীতি ও সম্ভাব্য নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন খোলামেলা সংলাপই হতে পারে সংকট নিরসনের পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত