প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রেজওয়ানুর আলমের বিরুদ্ধে এক নারী চিকিৎসককে অনৈতিক প্রস্তাব ও অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও রুজু করা হয়েছে। অভিযোগের গুরুত্ব এবং তদন্তে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বুধবার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়। বিষয়টি বৃহস্পতিবার রাতে প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর বিধান অনুসরণ করে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জুন মাসে একজন নারী চিকিৎসক বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে যোগদান করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, যোগদানের পর থেকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মো. রেজওয়ানুর আলম বিভিন্ন সময়ে অপ্রয়োজনে তাঁকে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠাতেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তিনি ওই নারী চিকিৎসকের প্রতি অনৈতিক প্রস্তাব দেন এবং অশালীন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করেন।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যধারা প্রস্তাবিত বা রুজু হলে অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা যায়। তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং তদন্তকাজে সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা এড়ানোর লক্ষ্যে রেজওয়ানুর আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগকারী নারী চিকিৎসক স্বাস্থ্য বিভাগের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। তাঁর ভাষায়, এই সিদ্ধান্ত সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর আচরণ দায়িত্বশীল ও পেশাদার হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বিভাগীয় কার্যক্রম নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী এগিয়ে যাবে এবং এটি কোনো ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়।
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রেজওয়ানুর আলম গণমাধ্যমকে জানান, তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে এর বাইরে আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাময়িক বরখাস্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়। এটি মূলত তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও অনৈতিক আচরণের অভিযোগ প্রতিরোধে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে কর্মপরিবেশ আরও নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক হয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে আস্থা পান।
আইনবিদদের মতে, সরকারি চাকরি আইন এবং বিদ্যমান প্রশাসনিক বিধিমালা অনুযায়ী, অভিযোগের তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বিরত রাখার সুযোগ রয়েছে। এতে তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার বা সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রাখবেন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের এই ঘটনাটি স্বাস্থ্য খাতে কর্মপরিবেশ, পেশাগত নৈতিকতা এবং কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের আইনগত অধিকার সংরক্ষণ করে স্বচ্ছ তদন্ত সম্পন্ন করাই হবে এই প্রক্রিয়ার প্রধান লক্ষ্য।