প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানুষের জন্ম, জীবন, মৃত্যু এবং পরকাল—এসব বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও গভীর। পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি সহিহ হাদিসেও মানুষের সৃষ্টি, তাকদির এবং জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ক্ষমতার অন্যতম প্রমাণ হলো মানুষের সৃষ্টি এবং তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সম্পর্কে পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থা। এ বিষয়ে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগুলোর একটি বর্ণনা করেছেন বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মাতৃগর্ভে সৃষ্টির ধাপ এবং জন্মের আগেই নির্ধারিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা তুলে ধরেছেন। ইসলামী আকিদা ও তাকদির সম্পর্কে এই হাদিসকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেন আলেমরা।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের সৃষ্টি মাতৃগর্ভে ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম চল্লিশ দিন সে নুতফা বা বীর্যরূপে অবস্থান করে। এরপর পরবর্তী চল্লিশ দিনে তা জমাট রক্তে পরিণত হয়। তারপর আরও চল্লিশ দিনে তা গোশতের টুকরোর মতো রূপ ধারণ করে। এই পর্যায়ের পর আল্লাহর নির্দেশে একজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং সেই ভ্রূণের মধ্যে রুহ ফুঁকে দেন।
হাদিসে আরও এসেছে, রুহ ফুঁকে দেওয়ার সময় ফেরেশতাকে চারটি বিষয় লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেগুলো হলো—ব্যক্তির রিজিক, তার আয়ু বা মৃত্যুর সময়, তার আমল এবং শেষ পরিণতিতে সে সৌভাগ্যবান (জান্নাতি) হবে নাকি দুর্ভাগা (জাহান্নামি) হবে। এই চারটি বিষয় মহান আল্লাহর সর্বজ্ঞ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁরই নির্দেশে সংরক্ষিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরপর অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এমনও হতে পারে যে একজন ব্যক্তি দীর্ঘ সময় জান্নাতিদের মতো আমল করতে থাকেন। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাকদিরে যা নির্ধারিত ছিল, তার ভিত্তিতে তিনি জাহান্নামিদের মতো আমল করে মৃত্যুবরণ করেন এবং জাহান্নামে প্রবেশ করেন। আবার এমনও হতে পারে, কেউ দীর্ঘ সময় জাহান্নামিদের মতো জীবনযাপন করলেও জীবনের শেষ মুহূর্তে তাওবা করে নেক আমলের পথে ফিরে আসেন এবং জান্নাত লাভ করেন। এই হাদিসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) মূলত জীবনের শেষ পর্যন্ত ঈমান ও নেক আমলের ওপর অটল থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই হাদিস কখনোই মানুষকে কর্মবিমুখ হওয়ার শিক্ষা দেয় না। বরং এটি আল্লাহর সর্বজ্ঞতা ও তাকদিরের প্রতি ঈমান দৃঢ় করার পাশাপাশি মানুষকে আমৃত্যু সৎকর্মে অবিচল থাকার আহ্বান জানায়। কারণ মানুষ জানে না তার শেষ পরিণতি কী হবে। তাই শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইবাদত, তাকওয়া, তাওবা এবং সৎকর্ম চালিয়ে যাওয়াই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
হাদিসটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মানুষের রিজিক নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইসলাম হালাল উপার্জনের নির্দেশ দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে যে প্রত্যেক মানুষের রিজিক আল্লাহ তাআলাই নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের পরিবর্তে বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করাই একজন মুসলমানের কর্তব্য।
একইভাবে মৃত্যুর সময়ও আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। কেউ নিজের আয়ু বাড়াতে বা কমাতে পারে না। তাই একজন মুমিনের উচিত প্রতিটি দিনকে আখিরাতের প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করা এবং সর্বদা নেক আমলের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত রাখা।
আলেমরা আরও বলেন, এই হাদিস মানুষের প্রতি বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা দেয়। বাহ্যিকভাবে কারও আমল দেখে তাকে নিশ্চিতভাবে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলে দেওয়া ইসলামী শিষ্টাচারের পরিপন্থী। কারণ প্রকৃত পরিণতি সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই অবগত। মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের আমল সংশোধন করা এবং অন্যদের জন্য কল্যাণের দোয়া করা।
মাতৃগর্ভে মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে এই হাদিস ইসলামের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যদিও হাদিসের মূল উদ্দেশ্য চিকিৎসাবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করা নয়, তবুও এতে মানুষের সৃষ্টির ধাপগুলো যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা ইসলামী জ্ঞানচর্চায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আল্লাহর সৃষ্টির নিখুঁত পরিকল্পনা ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন এতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
বর্তমান সময়ে অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা ও প্রতিযোগিতাময় জীবনে এই হাদিস একজন মুমিনকে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে এবং একই সঙ্গে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে উৎসাহিত করে। তাকদিরে বিশ্বাস মানে কর্ম থেকে বিরত থাকা নয়; বরং আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং ফলাফলের জন্য তাঁর ওপর নির্ভর করাই ইসলামের শিক্ষা।
ইসলামী গবেষকদের মতে, একজন মুসলমানের জীবনে এই হাদিসের বাস্তব প্রয়োগ হলো হালাল রিজিক অর্জন, নিয়মিত ইবাদত, পাপ থেকে বিরত থাকা, তাওবার দরজা খোলা রাখা এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপন করা। কারণ মানুষের প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হবে তার জীবনের শেষ পরিণতির মাধ্যমে।
সহিহ বুখারি (হাদিস: ৩২০৮), সহিহ মুসলিম (হাদিস: ৬৭২৩) এবং মুসনাদে আহমাদ (হাদিস: ৩৯৩৪)-এ বর্ণিত এই হাদিস মুসলমানদের জন্য গভীর শিক্ষা ও আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এটি মনে করিয়ে দেয়, জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও আখিরাত চিরস্থায়ী। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক আকিদা, বিশুদ্ধ আমল, হালাল রিজিক, উত্তম চরিত্র এবং ঈমানের সঙ্গে জীবন শেষ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।