এলডিসি উত্তরণে বড় বাধা কাঠামোগত দুর্বলতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
এলডিসি উত্তরণে বড় বাধা কাঠামোগত দুর্বলতা

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণকে কেবল একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি দেশের অর্থনীতি, উৎপাদন সক্ষমতা, শিল্পভিত্তি, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এই উত্তরণকে টেকসই করার প্রস্তুতি নিতে হবে। এমন বাস্তবতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং টেকসই উত্তরণ এক বিষয় নয়। উত্তরণ এমন হতে হবে, যা একটি দেশের উন্নয়নযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত না করে বরং আরও শক্তিশালী করে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সোমবার অনুষ্ঠিত ‘এলডিসি-জিআইএফ মেকানিজম ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড হাই-লেভেল ডায়ালগ’ অনুষ্ঠানে তিনি এ বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই উচ্চপর্যায়ের সংলাপের মূল লক্ষ্য ছিল স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সবুজ শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে এগিয়ে নেওয়া। উদ্যোগটি কপ-৩১-এর আগে এলডিসি গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ফ্যাসিলিটেশন বা এলডিসি-জিআইএফ ব্যবস্থার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

ড. তিতুমীর বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলো এখনো বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে। এসব দেশের অনেকেরই উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত এবং অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় শিল্পভিত্তি এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাত এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়ায় থাকা দেশগুলোর জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।

একটি দেশের এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণ সাধারণত অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু উত্তরণের পর বিশেষ কিছু আন্তর্জাতিক সুবিধা ও বাণিজ্যিক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় প্রস্তুতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সূচকে অগ্রগতি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার মতো উৎপাদন কাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং বৈদেশিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি।

এই বাস্তবতার কথাই তুলে ধরে ড. তিতুমীর মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্পায়ন, সমন্বিত উদ্যোগ, জ্বালানি রূপান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে উত্তরণকে এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে এটি কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে অর্জিত একটি মর্যাদা পরিবর্তন না হয়ে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার স্থায়ী উন্নয়নে পরিণত হয়।

এ জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। এলডিসিগুলোর অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ না হলে অনেক দেশের পক্ষে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।

ড. তিতুমীর বলেন, এলডিসিগুলোর প্রয়োজনের তুলনায় প্রযুক্তি হস্তান্তর এখনো অপ্রতুল। ফলে শুধু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থের সঙ্গে কার্যকর প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। একটি দেশের শিল্প খাতে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছানোর পর সেটি স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অবকাঠামো তৈরি না হলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন।

সবুজ শিল্পায়নের বিষয়টিও এ আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে কম কার্বন নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে এলডিসিগুলোর জন্য একই সঙ্গে শিল্পায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে তাদের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে জ্বালানি ব্যবহারে রূপান্তর ঘটিয়ে জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে হবে। ফলে উন্নয়ন ও পরিবেশ—দুই দিককে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে শিল্পনীতি তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে এলডিসি-জিআইএফ উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন ড. তিতুমীর। তাঁর আশা, এই ব্যবস্থা প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শিল্পে তার ব্যবহার ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি এলডিসিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে কাঠামোগত রূপান্তর এবং টেকসই উত্তরণের পথও শক্তিশালী হবে।

জাতিসংঘের উপস্থাপিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এলডিসি-জিআইএফ এমন একটি বৈশ্বিক সহযোগিতা কাঠামো হিসেবে কাজ করার কথা, যা এলডিসিগুলোর নিজস্ব অগ্রাধিকার ও প্রকল্পের সঙ্গে সবুজ প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা, প্রকল্প উন্নয়ন সহায়তা এবং অর্থায়নের উৎসকে যুক্ত করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০টি এলডিসিকে নিয়ে পাইলট কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই উদ্যোগের গুরুত্বের আরেকটি দিক হলো, সব এলডিসির প্রয়োজন এক নয়। কোনো দেশের প্রধান সমস্যা হতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, কোনো দেশের ক্ষেত্রে শিল্প প্রযুক্তি, আবার কোনো দেশের জন্য অর্থায়ন বা দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই একই ধরনের সহায়তা সবার ওপর প্রয়োগ না করে দেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে অর্থায়নের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো এলডিসিগুলোও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ঋণের চাপ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে উন্নয়ন বিনিয়োগের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর অর্থায়ন ছাড়া শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জ্বালানি রূপান্তর একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া অনেক দেশের জন্য কঠিন হতে পারে।

জাতিসংঘের এলডিসি বিষয়ক সাম্প্রতিক আলোচনাতেও দেখা যাচ্ছে, এই দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে তাদের জনসংখ্যার তুলনায় এখনো তুলনামূলকভাবে কম অংশীদার। জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণসংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত বিভাজন তাদের উন্নয়ন সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

তাই এলডিসি উত্তরণের আলোচনায় এখন শুধু কবে একটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণ করবে, সেই প্রশ্নই মুখ্য নয়। বরং উত্তরণের পর সেই দেশ কতটা প্রতিযোগিতামূলক থাকবে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে, কীভাবে শিল্পের বৈচিত্র্য বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।

ড. তিতুমীরের বক্তব্যে সেই বৃহত্তর বাস্তবতাই উঠে এসেছে। তাঁর মতে, এলডিসি উত্তরণ এমন একটি প্রক্রিয়া হওয়া প্রয়োজন, যা অর্থনীতিকে দুর্বল না করে আরও স্থিতিশীল করে এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা তৈরি করে। এজন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।

সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের আলোচনায় এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন, সবুজ শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। এলডিসি-জিআইএফ উদ্যোগ সামনে এগোলে তা কতটা কার্যকরভাবে প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও শিল্প সক্ষমতাকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, সেটিই হবে এর অন্যতম বড় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার সাফল্য নির্ধারণ করবে উত্তরণ কেবল একটি মর্যাদা পরিবর্তন হয়ে থাকবে, নাকি তা সত্যিকার অর্থে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত