প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার নিউইয়র্কে বৈঠকে বসছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির পথ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষের দূরপাল্লার হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং কয়েক মাস ধরে স্থবির হয়ে থাকা শান্তি উদ্যোগকে নতুন করে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
দুই নেতাই বর্তমানে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, তারা নিউইয়র্কে বৈঠক করতে সম্মত হয়েছেন। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তিনি একই সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে ইউক্রেনের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক উদ্যোগ বেশ কয়েকবার নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও তা পরে স্থবির হয়ে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের রাশিয়া ও ইউক্রেন সফরের মধ্য দিয়ে সেই আলোচনাকে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা শুরু হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, কয়েক মাসের বিরতির পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল।
তবে আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধের সামরিক পরিস্থিতিও আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেন সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষ করে তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শীত মৌসুম সামনে থাকায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
বৈঠকের আগে রাশিয়ার জ্বালানি খাত নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। ২১ সেপ্টেম্বর তিনি দাবি করেন, ইউক্রেনের হামলার কারণে রাশিয়া তার ডিজেল ও তেল পরিশোধন শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান। এর আগে ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও ডিজেল উৎপাদন স্থাপনায় হামলা না চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এসব হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও ডিজেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
জেলেনস্কি অবশ্য ইউক্রেনের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের জ্বালানি খাত, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও খাদ্য রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা বন্ধ করে, তাহলে ইউক্রেনও পাল্টা হামলা কমানোর বিষয়ে প্রস্তুত। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের পাশাপাশি কৃষ্ণসাগর এলাকায় সামরিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়টিও রয়েছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এই ধরনের পারস্পরিক বিরতির উদ্যোগকে শান্তি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে এরপরও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে মঙ্গলবারের বৈঠকে সম্ভাব্য একটি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি যুদ্ধবিরতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে।
এদিকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা চাহিদাও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সহায়তা চান। ইউক্রেনের আশঙ্কা, শীত মৌসুমে রাশিয়া দেশটির শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। এ কারণে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও কিয়েভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির সম্পর্কও এই বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। গত কয়েক মাসে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও উভয় নেতা বর্তমানে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছেন। ২০ সেপ্টেম্বরের ফোনালাপের পর জেলেনস্কি জানান, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিরাপত্তা, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান একটি বড় কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানসংক্রান্ত সংঘাতের দিকেও ছিল। এর ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনা কিছুটা গতি হারিয়েছিল। এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আবারও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার পথ সক্রিয় করার চেষ্টা করছে।
জেলেনস্কির নিউইয়র্ক সফরের সময় শুধু ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকই নয়, ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা এবং ইউক্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা তাঁর সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
মঙ্গলবারের বৈঠক তাই কেবল দুই প্রেসিডেন্টের আরেকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নয়। এর আলোচনায় যুদ্ধের বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য পারস্পরিক যুদ্ধবিরতির মতো বিষয় উঠে আসতে পারে। তবে বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। চলমান আলোচনার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হিসেবে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা কমানো এবং বৃহত্তর শান্তি আলোচনার পথ পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়টিই সামনে রয়েছে।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে ইউক্রেনের শহর, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনে যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কের বৈঠকটির দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রয়েছে। যুদ্ধের মাঠে হামলা অব্যাহত থাকলেও কূটনৈতিক আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠক সেই দরজাকে কতটা কার্যকরভাবে আবার খুলতে পারে, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।