টাইফুন দুজুয়ানে জাপানে ভয়াবহ বৃষ্টি, প্রাণহানি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
টাইফুন দুজুয়ানে জাপানে ভয়াবহ বৃষ্টি, প্রাণহানি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রবল বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস, বন্যা ও ভূমিধসে জাপানের পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক দুর্যোগ তৈরি করেছে শক্তিশালী টাইফুন দুজুয়ান। ঝড়টির প্রভাবে টোকিওসহ কানতো অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ বা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সরিয়ে নেওয়ার আওতায় থাকা মানুষের সংখ্যা ১৬ লাখের বেশি থেকে প্রায় ২০ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।

টাইফুনের প্রভাবে ভারি বৃষ্টিতে বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি জমে গেছে এবং পাহাড়ি ও ঢালু অঞ্চলে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। কানাগাওয়া ও চিবা প্রদেশে ভূমিধসের কারণে প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে অন্তত দুইজনের মৃত্যুর কথা জানানো হলেও পরে কিছু প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের সন্ধানে উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। ফলে দুর্যোগের পূর্ণ চিত্র এখনো পরিষ্কার হয়নি।

জাপানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই টাইফুনটির সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। বিশেষ করে ভারি বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কায় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়। ইজু দ্বীপপুঞ্জের কিছু এলাকায় সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিধস সতর্কতাও জারি করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কানতো অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বৃষ্টি ও বন্যার জন্য উচ্চমাত্রার সতর্কতা কার্যকর ছিল।

টাইফুন দুজুয়ানের কারণে জাপানের পূর্ব উপকূলের অনেক এলাকায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং টোকিও ও আশপাশের বিভিন্ন রেলপথে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত রাখা হয়েছে। ঝড়ের তীব্রতার কারণে বিমানবন্দরগুলোতেও যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। জাপান এয়ারলাইনস ও অল নিপ্পন এয়ারওয়েজসহ বড় বিমান সংস্থাগুলো বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করেছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। ঝোড়ো বাতাস ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে হাজার হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিছু প্রতিবেদনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বা পরিবারের বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সংকট দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

কানাগাওয়া প্রদেশের মিউরা এলাকায় ভূমিধসে কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চালাচ্ছেন। অন্যদিকে চিবা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকাতেও ভারি বৃষ্টির পর ভূমিধস ও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বাড়ির বাইরে বের হতে পারেননি। কোথাও কোথাও রাস্তায় হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলও বিপজ্জনক হয়ে পড়ে।

টোকিওর কাছাকাছি ইচিকাওয়া শহরের বিভিন্ন সড়কও পানিতে তলিয়ে যায়। কামাকুরার মতো জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাতেও বৃষ্টির পানি জমে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মানুষকে অপ্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে কোথাও কোথাও পানি বাড়ার পাশাপাশি ভূমিধসের আশঙ্কাও অব্যাহত ছিল।

ঝড়ের কারণে জাপানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক আয়োজনেও প্রভাব পড়েছে। টোকিও গেম শোসহ কয়েকটি আয়োজনের নির্ধারিত কার্যক্রম বাতিল বা আগেভাগে শেষ করতে হয়েছে। চিবা অঞ্চলের একটি বড় সংগীত আয়োজনও আবহাওয়ার কারণে বাতিল করা হয়। ঝড়টি এমন এক সময়ে জাপানের ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে, যখন দেশটিতে ধারাবাহিক সরকারি ছুটির কারণে পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বেশি।

টাইফুন দুজুয়ান জাপানের চলতি মৌসুমের ২৫তম টাইফুন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঝড়টি জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছ দিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে পরে সমুদ্রের দিকে সরে যেতে শুরু করে। মঙ্গলবারের শুরুতে ঝড়ের গতিপথ জাপানের উপকূল থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছিল বলে আবহাওয়া সংস্থাগুলো জানিয়েছে। তবে ঝড় সরে গেলেও এর সঙ্গে আসা অতিবৃষ্টির কারণে নদী, পাহাড়ি ঢাল ও নিচু এলাকার ঝুঁকি তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হয়ে যায়নি।

আবহাওয়াবিদদের মতে, টাইফুনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো অল্প সময়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত। জাপানের কিছু এলাকায় কয়েক ঘণ্টা বা এক দিনে এমন পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিক সেপ্টেম্বরের দীর্ঘ সময়ের বৃষ্টিপাতের কাছাকাছি। ইজু দ্বীপপুঞ্জের ওশিমা শহরে ২৪ ঘণ্টায় ৬৮৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া গেছে। চিবা ও কানাগাওয়ার কিছু এলাকাতেও কয়েকশ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে সমুদ্রের ঢেউ ও ঝোড়ো বাতাসও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দুজুয়ানের সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ থেকে ১৪৪ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঝোড়ো বাতাসের বেগ আরও বেশি ছিল। এর ফলে গাছপালা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাস্তায় চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

টাইফুনের প্রভাবে জাপানের এশিয়ান গেমস আয়োজনেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে। আবহাওয়ার কারণে কিছু প্রতিযোগিতা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এর আগে ঝড়টির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় আয়োজকরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতার নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

এদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও ঝড়ের কারণে পরিস্থিতি আলোচনায় আসে। টাইফুনের প্রভাবের মধ্যেও তার নিউইয়র্ক সফর চালিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে দেশে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।

দুজুয়ানের প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনো তৈরি হয়নি। ঝড়ের পর উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গম ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রবেশ করে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার কাজও চলছে। তবে নতুন করে ভারি বৃষ্টি হলে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নিচু এলাকায় বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ।

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। উষ্ণ সমুদ্রের পানি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের জন্য বেশি শক্তি ও জলীয়বাষ্প সরবরাহ করতে পারে, ফলে কিছু ঝড় অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে টাইফুনের মোট সংখ্যা সরাসরি বেড়ে যাচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। বরং গবেষণায় ঝড়ের শক্তি, বৃষ্টিপাতের ধরন ও আঞ্চলিক পরিবর্তনের বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জাপানের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঝড়-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ রাখা। টাইফুনটি উপকূল থেকে সরে গেলেও অতিবৃষ্টির পানি, দুর্বল হয়ে পড়া পাহাড়ি ঢাল এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো নতুন বিপদের কারণ হতে পারে। তাই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা এবং আবহাওয়ার সর্বশেষ সতর্কতা অনুসরণ করাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত