প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
শেরপুরের নকলায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাহাত হাসান কাইয়ুমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাহাত হাসান কাইয়ুম সংগঠনের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় প্রাথমিক সদস্যপদসহ ছাত্রদলের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো।” কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে তাৎক্ষণিকভাবে।
এর আগের দিন বুধবার দুপুরে নকলা উপজেলা কমপ্লেক্সের কৃষি অফিসে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার মোরসালিনের ওপর অফিসকক্ষেই হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদল নেতা রাহাত হাসান কাইয়ুম ও তার সহযোগী ফজলুল হকের বিরুদ্ধে। সরকারি অফিসে ঘটে যাওয়া এই হামলায় কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে উপজেলা কৃষি অফিসে প্রবেশ করেন রাহাত হাসান কাইয়ুম, ফজলুল হকসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা। তারা কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির তালিকা নিয়ে কর্মকর্তার কাছে জানতে চান এবং দাবি করেন, “কোন নেতাকে কত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে” সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে। কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার মোরসালিন তখন জানান, এই প্রকল্পের বরাদ্দ নির্ধারিত কৃষকদের নামেই দেওয়া হয়—এটি সম্পূর্ণ সরকারি প্রণোদনা, কোনো রাজনৈতিক কোটা বা দলীয় বরাদ্দ নয়।
এ উত্তর শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন রাহাত ও তার সহযোগীরা। প্রথমে গালাগাল ও হুমকি দেওয়া শুরু হয়, একপর্যায়ে তারা কর্মকর্তার ওপর চড়াও হন এবং শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে অভিযোগ। চিৎকার শুনে অফিসের অন্যান্য কর্মচারীরা এগিয়ে এসে আহত কর্মকর্তাকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
বিকেলেই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার মোরসালিন বাদী হয়ে নকলা থানায় মামলা করেন। মামলায় অভিযুক্ত করা হয় উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাহাত হাসান কাইয়ুম (৩৫) ও তার সহযোগী ফজলুল হককে (৩২)। অভিযোগের ধারা অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, মারধর ও ভীতি প্রদর্শনের মামলা রুজু করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বীজ ও সার বিতরণের প্রস্তুতি চলছিল। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে নির্ধারিত কৃষকদের তালিকা উপজেলা অফিসে পাঠানো হয় এবং তা যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত করা হচ্ছিল। এই সময় কিছু রাজনৈতিক কর্মী তালিকায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলে তা নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। বুধবারের ঘটনাটি সেই উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা।
এদিকে, ঘটনায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্রুত অবস্থান স্পষ্ট করে। তারা জানায়, সংগঠন কোনোভাবেই এমন আচরণকে প্রশ্রয় দেয় না। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ছাত্রদল জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করে। প্রশাসনের সঙ্গে সহিংস আচরণ বা সরকারি কাজে বাধা দেওয়া সংগঠনের নীতির পরিপন্থী।”
নকলা উপজেলা ও শেরপুর জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানিয়েছেন, সরকারি দপ্তরে হামলা একটি গুরুতর অপরাধ। তিনি বলেন, “এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ওপর হামলা নয়, এটি সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি। তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনার পর থেকে নকলা উপজেলা কমপ্লেক্সে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা আতঙ্কের মধ্যেও নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আহত কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার মোরসালিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় বলেন, “আমি শুধু নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছিলাম। রাজনৈতিক পরিচয়ে কেউ প্রণোদনা পেতে পারে না—এই কথাই বলেছিলাম। তার জন্য এমন হামলা হবে, তা ভাবিনি।”
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে মন্তব্য করেছেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপকে “সঠিক ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত” হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
জেলা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনিয়ম বা সহিংসতায় দল কখনোই জড়িত থাকতে পারে না। আমাদের সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।”
অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা তরুণ রাজনীতিকদের দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বগুণের প্রশ্নও নতুন করে উত্থাপন করেছে। রাজনৈতিক দলের শৃঙ্খলা রক্ষা ও সরকারি ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, মামলার তদন্ত চলমান। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। প্রাথমিকভাবে হামলার ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, সরকারি কাজে দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তারা যাতে রাজনৈতিক চাপে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্ত দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি বার্তা দিয়েছে—সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জায়গায় কোনো ছাড় নেই। আর নকলা উপজেলা কৃষি অফিসের এই ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণ ও রাষ্ট্র উভয়ই।