প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ময়মনসিংহের একটি আদালত সহকর্মীকে হত্যা করার দায়ে এক পুলিশ দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-১ এর বিচারক হারুন-অর রশিদ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্তরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
ফাঁসির আদেশ প্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা হলেন কনস্টেবল মো. আলাউদ্দিন এবং তার স্ত্রী কনস্টেবল নাসরিন নেলী। আলাউদ্দিনের বাড়ি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার ভবানীপুর এলাকায়। আদালতের নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রেক্ষাপট ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে সৃষ্টি হয়।
২০১৪ সালে নাসরিন নেলীর সঙ্গে সহকর্মী কনস্টেবল সাইফুল ইসলামের মধ্যে পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্কের জের ধরে নাসরিন নেলী এবং তার স্বামী আলাউদ্দিন ময়মনসিংহ শহরের কাঁচিঝুলি এলাকায় নেলীর ভাড়া বাসায় আগস্ট মাসে সাইফুল ইসলামের হত্যা করেন। হত্যার পর তারা নিহতের লাশ বস্তাবন্দী করে গুম করার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের টাউন হল মোড়ে তল্লাশির সময় তাদের হাতেনাতে ধরা পড়ে।
নিহত সাইফুল ইসলামের মা মুলেদা বেগম ওই বছর ১৩ আগস্ট ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় কনস্টেবল আলাউদ্দিন, নাসরিন নেলী এবং আরও দুজনকে আসামি করা হয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরে আদালত আজ রায় ঘোষণা করে।
ময়মনসিংহ আদালত পরিদর্শক পিএসএম মোস্তাছিনুর রহমান জানান, হত্যার এই মামলায় আদালত দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। তিনি আরও বলেন, “মামলার প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের বিবরণ আদালতের রায়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।”
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ পেলে পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্কের ছাপ পড়ে। নিহত সাইফুল ইসলাম ছিলেন এলাকার পরিচিত মুখ এবং স্থানীয় পুলিশি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার অকাল মৃত্যু এলাকায় উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা বলেন, “একজন সহকর্মীর হাতে অপর একজন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু দুঃখজনক এবং এটি পুলিশের ভাবমূর্তির জন্যও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।”
মামলার নথি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের দিন নাসরিন নেলী এবং আলাউদ্দিন পরিকল্পিতভাবে নিহতকে তার বাসায় আনার পরে শারীরিকভাবে হত্যা করেন এবং লাশ লুকানোর চেষ্টা করেন। তদন্তের সময় পুলিশের দল প্রমাণ পায় যে এই হত্যাকাণ্ড পূর্বনির্ধারিত এবং ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপূর্ণ।
আদালতের রায়ের ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর একজন সদস্যের দ্বারা অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচারের দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া অপরিহার্য। এই রায় আইনের প্রতি আস্থা ও ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
নাসরিন নেলী ও আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন সাক্ষ্য, প্রমাণপত্র এবং পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হয়। আদালত সমস্ত প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয় যে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন দম্পতির দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ ও আদালত কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, এই মামলার দ্রুত বিচার ও দোষীদের শাস্তি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে। তারা আশা করছেন, এই রায় অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে, যাতে কেউ ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে সহকর্মী বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের পথে না যায়।
নিহত সাইফুল ইসলামের পরিবার ও স্থানীয় জনগণ রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, “আমরা আশা করি এই রায় আমাদের ক্ষতিপূরণ এবং ন্যায়বিচারের অনুভূতি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করবে। আইনশৃঙ্খলা সংস্থার কাছে আমরা আমাদের আস্থা রেখেছি।”