প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের চৌধুরীহাট গ্রামে বিএনপি কর্মী আব্দুল হাকিম হত্যাকাণ্ড একটি সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলার ফলাফল বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু সোমবার বিকেলে ২ নম্বর গেটে সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর বিকেলে আব্দুল হাকিম প্রাইভেট কারে বাগোয়ান থেকে শহরে ফেরার পথে হঠাৎই হামলার শিকার হন। মদুনাঘাট সেতুর পশ্চিম প্রান্তে মোটরসাইকেলে এসে পাঁচজন অস্ত্রধারী তার গাড়ি লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছুড়ে। এই বর্বরোচিত হামলায় ঘটনাস্থলেই আব্দুল হাকিম মারা যান, তার গাড়িচালক গুরুতর আহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যায় মোট ১৫ জন অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে পাঁচজন সরাসরি গুলি চালায়, দুইজন মোটরসাইকেলে করে অনুসরণ করে, একজন সেতুর অপর পাশ থেকে তদারকি করে এবং মূল পরিকল্পনাকারীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
হত্যার পর জেলা পুলিশ ও রাউজান থানা যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। রোববার রাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত নোয়াপাড়া ইউনিয়নের চৌধুরীহাট গ্রামের আয়ুব আলী সওদাগরের বাড়ির পুকুরপাড়ে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে গত বছর পুলিশি ভাণ্ডার থেকে খোয়া যাওয়া চাইনিজ রাইফেল, যার সিরিয়াল নম্বর পুলিশের রেকর্ডের সঙ্গে মিলে গেছে। এছাড়াও উদ্ধার হয়েছে একটি শটগান, সাত রাউন্ড গুলি, চারটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলভার, মোট ৪৯ রাউন্ড রাইফেলের গুলি, একাধিক ম্যাগাজিন এবং দেশীয় অস্ত্র। পুলিশ বলেছে, হত্যায় ব্যবহৃত মোট পাঁচটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ৩১ অক্টোবর গরীব উল্লাহপাড়া এলাকা থেকে মো. আবদুল্লাহ খোকন নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে খোকন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং জড়িতদের নাম প্রকাশ করেন। এরপর আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মো. মারুফ, জিয়াউর রহমান, মো. সাকলাইন হোসেন, মো. সাকিব এবং শাহেদ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল, রিভলভার, গুলি এবং হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল।
জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী বালুমহাল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলা দ্বন্দ্ব জড়িত। তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এই ঘটনার সঙ্গে সাতটি পৃথক সন্ত্রাসী চক্র কার্যকর ছিল এবং স্থানীয় প্রভাবশালী বালুমহাল ব্যবসায়ীরাও এতে জড়িত। তিনি আরও বলেন, হত্যার অর্থদাতা এবং মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।
রাউজান উপজেলায় বর্তমানে সাতটি গ্রুপ টার্গেট কিলিং চালাচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, ৫ আগস্টের পর থেকে জেলায় ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে সাতটি আধিপত্য সংক্রান্ত এবং বাকিগুলো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে। পুলিশ সতর্ক করে জানিয়েছে, সন্ত্রাসীরা যদি আত্মসমর্পণ না করে তবে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় ও দেশের নিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুলিশি অভিযান, অস্ত্র উদ্ধারের প্রক্রিয়া এবং গ্রেপ্তার কার্যক্রম একদিকে যেমন অপরাধীদের মুখোমুখি করছে, অন্যদিকে তা সমাজে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, এটি স্থানীয় আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সামাজিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
জেলার মানুষ বলেন, এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজকে আতঙ্কিত করছে। শহরের সাধারণ মানুষ এখন নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রত্যাশা করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হবে, এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে রাউজান এবং চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী চক্রের কার্যক্রমের প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে। পুলিশি তৎপরতা, অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান এবং গ্রেপ্তার কার্যক্রম একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে—দেশে কেউ অপ্রতিরোধ্য নয়, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কার্যক্রমে সর্বদা সক্রিয়। সাধারণ মানুষ আশা করছেন, প্রশাসনের কার্যক্রম ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে রাউজান উপজেলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার হবে এবং স্থানীয় জনগণ শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবে।
এই হত্যাকাণ্ড এবং তদন্ত প্রক্রিয়া প্রমাণ করছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধিপত্য, সম্পদ ও ক্ষমতা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কতটা মারাত্মক হতে পারে। তবে পুলিশের নিবিড় তৎপরতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিরোধে সহায়ক হবে, যা সামাজিক শান্তি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।