কেন যুক্তরাজ্যে পাকিস্তান-বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে বাধা বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৮ বার
যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করে আর্থিক স্থিতি বজায় রেখেছে এবং তাদের বহুজাতিক পরিবেশকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তিই সবচেয়ে বড় অংশ পূরণ করে এসেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে বহু ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় নীরবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ভর্তির ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাবি করছে, এটি বৈষম্য নয়; বরং যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের কঠোর ভিসা নীতির কারণে তারা বাধ্য হয়ে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। যদিও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা—কারণ সবচেয়ে বেশি ভর্তির নিষেধাজ্ঞা ও আবেদন বাতিল হচ্ছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকেই।

এ সিদ্ধান্তের ফলে দুই দেশের প্রকৃত শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও আর্থিক ব্যয় সত্ত্বেও অনেকে শেষ মুহূর্তে জানতে পারছেন, তাদের আবেদন স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদের স্পনসর লাইসেন্স বাঁচানোর তাগিদ।

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফিনান্সিয়াল টাইমস ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে যে কমপক্ষে ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ” হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় হয় ভর্তিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, নয়তো আবেদনের সংখ্যা সীমিত করে রেখেছে। তারা বলছে, হোম অফিস নতুন করে স্টুডেন্ট ভিসার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনার ঘটনা বেড়ে গেছে। বর্ডার সিকিউরিটি মন্ত্রী ডেম এঞ্জেলা ঈগল মন্তব্য করেছেন, স্টুডেন্ট ভিসাকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার পিছনের দরজায় পরিণত করা যাবে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

চেস্টার, উইলভারহ্যাম্পটন, সান্ডারল্যান্ড, ইস্ট লন্ডন, কোভেন্ট্রি, লন্ডন মেট্রোপলিটনসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ভর্তি স্থগিত বা বন্ধ রেখেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের শরৎকাল পর্যন্ত এমন নিষেধাজ্ঞা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে গেছে, যা তাদের স্পনসর লাইসেন্সকে ঝুঁকিতে ফেলছে। লন্ডন মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভিসা রিজেকশন তাদের মোট প্রত্যাখ্যানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, যা তাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

হোম অফিসের বড় পরিবর্তন এসেছে ২০২৫ সালে। স্টুডেন্ট ভিসার স্পনসর হিসেবে থাকতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন মৌলিক সম্মতি মূল্যায়ন (বিসিএ) আরও কঠোরভাবে পাস করতে হবে। ভিসা রিফিউজালের সীমা যেখানে আগে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ছিল, তা কমিয়ে আনা হয়েছে ৫ শতাংশে। অর্থাৎ, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আবেদনের মাত্র পাঁচজনের ভিসা বাতিল হলেও তাদের স্পনসর লাইসেন্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত কঠোর মানদণ্ডে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে পাকিস্তান-বাংলাদেশের মতো উচ্চ রিফিউজাল রেট থাকা দেশ থেকে নির্বিঘ্নে শিক্ষার্থী নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২২ শতাংশ। নতুন ৫ শতাংশ সীমার তুলনায় যা তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝুঁকি এড়াতে প্রবেশপত্র দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে বা পুরোপুরি বন্ধ করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অভিযোগ করেছে, তাদের ভর্তির সংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশই হোম অফিস শেষ ধাপে এসে বাতিল করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক আশ্রয়ের সংখ্যা বৃদ্ধিও একটি বড় কারণ। যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের তথ্যমতে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আগত অনেক শিক্ষার্থী বা স্বল্প মেয়াদি ভিসাধারী পরবর্তীতে আশ্রয় আবেদন করছেন, যার সংখ্যা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এর ফলে হোম অফিস এই দুই দেশকে “ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে দেখছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও সতর্ক থাকতে বলছে।

এসব সিদ্ধান্তের বড় প্রভাব পড়ছে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের ওপর। লাহোরের শিক্ষা পরামর্শক মারিয়াম আব্বাস বলেন, অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে আসে, উচ্চ ফি জমা দেয়, মেডিকেল ও ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তারপরও শেষ ধাপে এসে জানতে পারে তাদের আবেদন স্থগিত হয়েছে। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ত্রুটিও দায়ী। অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি এজেন্টদের ওপর অত্যধিক নির্ভর করে, যাচাই-বাছাই ঠিকমতো না করে চাহিদা পূরণের জন্য হঠাৎ বেশি ভর্তি নেয়, পরে রিফিউজাল রেট বেড়ে গেলে দোষ চাপিয়ে দেয় শিক্ষার্থীদের ওপর।

হোম অফিসের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের অন্তত ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় কঠোর নতুন মানদণ্ডে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান স্টুডেন্ট ভিসার স্পনসর লাইসেন্স হারাতে পারে। যদি তা ঘটে, তবে প্রায় ১২ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ হারাতে পারেন। এই সম্ভাবনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মারাত্মক সতর্ক করেছে, ফলে তারা ঝুঁকির কোনো সুযোগ নিতে চাইছে না।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

হোম অফিস বলছে, কঠোর নিয়ম আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করার জন্য নয়; বরং নিশ্চিত করার জন্য যে যুক্তরাজ্যে যারা আসছেন তারা সত্যিকার অর্থে পড়াশোনা করতে আসছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, নতুন নিয়ম এতটাই কড়া যে প্রকৃত শিক্ষার্থীরাও এর শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে যুক্তরাজ্যের সুনাম ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক শিক্ষার্থী বিকল্প হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপের দিকে ঝুঁকছেন।

সমালোচকদের মতে, পুরো ঘটনাটি রাজনৈতিক। নেট মাইগ্রেশন কমানোকে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী ভিসা—যা যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশ—সেই খাত থেকেই শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রণের কঠোরতা। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে মূলত তাদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই চাপ সৃষ্টি করছে বিশাল সংখ্যক আবেদন ও বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিতর্ক।

এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নীতি কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সাল থেকে ধীরে ধীরে ভর্তির প্রক্রিয়া চালু করার কথা বলছে, আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণ নতুন যাচাই-বাছাই পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা করছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে—আজকে যে শিক্ষার্থী তার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আশা নিয়ে ফি জমা দিয়েছে, সে হয়তো কালই জানতে পারে তার নাম আপাতত ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ তালিকার কারণে বাদ পড়েছে।

এ অবস্থায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পরিবারগুলো গভীর অনিশ্চয়তা ও দুঃশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা এক সময় এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ঠিকানা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন তা ক্রমেই কঠিন ও দূরবর্তী করে তুলছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই সংকট সমাধানে হোম অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরামর্শকদের মধ্যে স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সঠিক তথ্যনির্ভর যাচাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। না হলে, প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরাও যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত