অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক সংকট: সাধারণ মানুষের ওপর বাড়ছে চাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৩ বার
অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক সংকট: সাধারণ মানুষের ওপর বাড়ছে চাপ

প্রকাশ: ০৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে এখন যেন ঘন কালো মেঘের আনাগোনা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্প্রতি কার্যকর হওয়া বিদ্যুতের বাড়তি দাম যেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা উদ্বেগজনক। ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, অর্থনীতির এই নাজুক অবস্থায় সাধারণ মানুষের পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা, যার প্রভাব পড়ছে তাদের নিত্যদিনের ক্রয়ক্ষমতার ওপর।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর দিকে আলোকপাত করেছেন। তার মতে, মূল্যস্ফীতির হার কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই, বরং জ্বালানি মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। পরিবহণ ও সেবা খাতের লাগামহীন খরচ বৃদ্ধির ফলে খাদ্যপণ্যসহ প্রতিটি জিনিসের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা ভারী হওয়ায় নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবন এখন চরম সংকটাপন্ন। মানুষ তার সঞ্চয় ভেঙে কিংবা জীবনযাত্রার মান কমিয়ে কোনোমতে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় বাস্তবসম্মত ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক ধরনের হুমকি।

বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। সিপিডির জরিপে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য; কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার পর খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার দাম ৭০ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর অর্থ হলো, কৃষক সঠিক দাম পাচ্ছেন না এবং ভোক্তা অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। মাঝে থাকা একশ্রেণির অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী এই সুযোগে বিপুল মুনাফা লুফে নিচ্ছে। ফাহমিদা খাতুন যথার্থই বলেছেন যে, এই মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত সংকটের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তাই সরকার যদি কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি করতে না পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের সরাতে না পারে, তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। খুচরা ও পাইকারি বাজারের ব্যবধান কমানো এখন সময়ের প্রধান দাবি।

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত জানিয়েছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কিছুটা সমন্বয় অপরিহার্য হতে পারে, তবে তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। যথেচ্ছভাবে দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ প্রয়োগ করা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। জ্বালানি তেলের এই উচ্চমূল্য কেবল সাময়িক সংকট তৈরি করবে না, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিতে পারে। কল-কারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প চাপের মুখে পড়ছে। একদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ, অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের শ্লথগতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি।

অবশ্য আশার কথা যে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি এবং লেনদেনের ভারসাম্যে কিছু উন্নতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও রপ্তানি ও বিনিয়োগের চাহিদা দুর্বল থাকায় তা দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। শ্রম অধিকারের বিষয়টি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আসা সতর্কবার্তা আমাদের গার্মেন্টস শিল্প ও অন্যান্য রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। সময়মতো মজুরি প্রদান, কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলোতে অবহেলা করার সুযোগ এখন নেই। সিপিডি পরামর্শ দিয়েছে, সরকার যদি কোনো প্রণোদনা তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দেয়, তবে অবশ্যই সেখানে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার শর্ত জুড়ে দেওয়া উচিত।

অর্থনীতির এই উত্তরণকালীন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং কঠোর প্রশাসনিক তদারকি। কেবল তথ্যের বিশ্লেষণ নয়, বরং সাধারণ মানুষের কষ্টে প্রলেপ দেওয়ার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন অটুট রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা এখন সময়ের বড় দাবি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই প্রতিটি নীতি নির্ধারণ করা হোক, যেন উন্নয়নের সুফল কেবল গুটিকয়েক মানুষের কাছে নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হবে, কিন্তু তার জন্য সাধারণ মানুষের জীবনকে বলি দেওয়া যাবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত