প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই বিতর্ক, বিস্ময় আর কৌতূহল একসঙ্গে ভর করে, সেই সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর আখতারুজ্জামান আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপি থেকে রেকর্ড পাঁচবার বহিষ্কৃত এই বহুল আলোচিত রাজনীতিক এবার যোগ দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে। শনিবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন তিনি। খবরটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল ও টকশোতে শুরু হয় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা।
রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলেও মেজর আখতারুজ্জামানের পরিচিতি মূলত তার অপ্রত্যাশিত ও অনেক সময় বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে। কখনো এসব মন্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রবল সমালোচনার ঝড়, আবার কখনো তা রীতিমতো হাস্যরসের খোরাক জুগিয়েছে। বিএনপির মতো বড় একটি দলে থেকেও বারবার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হওয়া, আবার ফিরে আসা—এই ওঠানামার রাজনীতি তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশে কোনো রাজনীতিকের ক্ষেত্রে পাঁচবার বহিষ্কৃত হয়ে চারবার দলে ফিরে আসার নজির প্রায় নেই বললেই চলে।
জামায়াতে যোগদানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেজর আখতারুজ্জামান যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিই নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। গণমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াত সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, সেটিই তাকে জামায়াতে যোগ দিতে প্ররোচিত করেছে। তারেক রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আখতারুজ্জামান বলেন, জামায়াত লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে—এই মন্তব্য শুনে তিনি ভেবেছেন, যারা এত মানুষ মারতে পারে, তারা তো শক্তিশালী; তাই তাদের পাশে থাকাই যুক্তিযুক্ত। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। কেউ কেউ একে রাজনৈতিক রসিকতা হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে এটিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অরুচিকর মন্তব্য বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, আখতারুজ্জামান তাদের নীতি, আদর্শ ও দেশপ্রেমের অবস্থানের প্রতি আস্থা রেখেই জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়, দলের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে আখতারুজ্জামান ইসলামি মূল্যবোধ, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জামায়াতের ভূমিকার প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি অবশিষ্ট জীবন ইসলাম ও দেশের স্বার্থে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের প্রতি অনুগত থাকার অঙ্গীকার করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মেজর আখতারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদান নিছক দলবদলের ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিন মূলধারার রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ার পর তিনি নতুন একটি রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। আবার কেউ বলছেন, জামায়াতের পক্ষ থেকেও এটি একটি ‘চমক’ সৃষ্টি করার কৌশল হতে পারে, যাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যায়। তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, একজন এতটা বিতর্কিত ও অনিয়মিত বক্তব্যের জন্য পরিচিত রাজনীতিককে দলে নেওয়ার মাধ্যমে জামায়াত কী বার্তা দিতে চায়।
কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে পরপর দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। সেই সময় থেকেই তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তবে সংসদে ভূমিকার চেয়ে তার বক্তব্য ও আচরণই বেশি আলোচিত হয়েছে। কখনো বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, কখনো তারেক রহমান, আবার কখনো দলীয় সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করে তিনি দল ও সমর্থকদের অস্বস্তিতে ফেলেছেন। তবুও অজানা কোনো রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি বারবার দলে ফিরেছেন, যা তার রাজনৈতিক জীবনের রহস্যময় দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৩ সালের ৮ জুন হঠাৎ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি নতুন করে আলোচনায় আসেন। নিজেই তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। সে সময় শেখ হাসিনার প্রশংসা করে দেওয়া তার বক্তব্য বিএনপির ভেতরেও বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন ঘটলেও, তাকে নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করে আবারও বিতর্কে জড়ান আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা আবার দেশে ফিরে আসবেন—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। এই মন্তব্য রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অনেকেই মনে করেন।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েও তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। এক টকশোতে তিনি বলেন, মবের মাধ্যমে ড. ইউনূসের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এই বক্তব্য নিয়েও সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার ওপর সবশেষ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে করা একটি মন্তব্য তাকে আরও বিতর্কিত করে তোলে। একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি বলেন, মিডিয়াগুলো কি নিউজ করছে—খালেদা জিয়া তো বেঁচে নেই। এই মন্তব্যকে অনেকেই নিষ্ঠুর ও দায়িত্বহীন বলে অভিহিত করেন।
এই দীর্ঘ বিতর্কিত অতীতের পর জামায়াতে যোগদানের সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ রাজনৈতিক ইউটার্ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে তার চরিত্রের ধারাবাহিকতা বলেও মনে করছেন। আখতারুজ্জামান নিজে অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি জামায়াতে যোগ দিলেও কোনো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি নির্বাচনী রাজনীতির চেয়ে আদর্শিক অবস্থানের বিষয়।
জামায়াতে যোগদানের আনুষ্ঠানিকতায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম উপস্থিত ছিলেন। জামায়াত আমির তাকে আন্তরিকভাবে আলিঙ্গন করেন এবং দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করেন বলে দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মেজর আখতারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি করেছে। এটি আদর্শিক পরিবর্তন, নাকি কেবল আলোচনায় থাকার আরেকটি কৌশল—সে উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, তার রাজনীতিতে থাকা মানেই বিতর্ক, আর সেই বিতর্ক আগামী দিনগুলোতেও থামছে না।