হাদির স্মরণে শিবির নেতার আবেগঘন বক্তব্য, তদন্তের দাবি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
কাল সিঙ্গাপুরে নেওয়া হচ্ছে হাদি, সংকটময় চিকিৎসার নতুন অধ্যায়

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শরিফ ওসমান হাদিকে ঘিরে আবেগ, ক্ষোভ ও প্রশ্নে ভারী হয়ে উঠেছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ। ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বরের সাত শহীদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে শনিবার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম যে বক্তব্য দেন, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। তার বক্তব্যে হাদিকে ‘জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সেনা নায়ক’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি ‘গুপ্ত ও নিষিদ্ধ বাহিনী’র হামলার অভিযোগ তুলে ধরা হয়, যা ঘটনাটির প্রকৃতি ও পরবর্তী তদন্ত নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উসকে দিয়েছে।

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম তার বক্তব্যে বলেন, শরিফ ওসমান হাদি আজীবন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বর ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাদি কেবল একজন সংগঠক বা কর্মী নন, বরং একটি সময়ের প্রতীক, যিনি রাজপথে থেকে প্রতিবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, হাদির ওপর যে হামলা হয়েছে, তা পরিকল্পিত এবং এর পেছনে ‘গুপ্ত ও নিষিদ্ধ বাহিনী’ সক্রিয় ছিল। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সংস্থার নাম উল্লেখ করেননি, তবুও তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।

সভায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শিবির সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুই থেকে তিন দিন আগেও হাদির সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। সে সময় হাদি তাকে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, তিনি তখন বারবার হাদিকে সাবধানে থাকতে অনুরোধ করেছিলেন এবং বাইরে না বেরোতে বলেছিলেন। কিন্তু হাদি তার জবাবে যে কথা বলেছিলেন, তা উপস্থিত সবার মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে। নুরুল ইসলাম সাদ্দামের ভাষ্যমতে, হাদি বলেছিলেন, মৃত্যু কোথায় হবে তা আসমানেই নির্ধারিত। ঘরের ভেতরে থেকেও মৃত্যু আসতে পারে, তাই তিনি রাজপথেই থাকতে চান এবং সেখানেই জীবন দিতে প্রস্তুত।

এই বক্তব্য শোনার সময় সভাস্থলে উপস্থিত অনেকের চোখে পানি দেখা যায়। বক্তৃতার একপর্যায়ে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে হাদির প্রাণভিক্ষা কামনা করেন এবং বলেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে আরও কিছু সময় সমাজ ও আন্দোলনের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তার এই আহ্বান সভায় উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে আবেগী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

অনুষ্ঠানটি ছিল ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বরের সাত শহীদের স্মরণে আয়োজিত, যাদের মৃত্যু নিয়ে দেশজুড়ে তখন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে বক্তারা বলেন, ওই সময়টি ছিল দেশের ইতিহাসের এক অস্থির অধ্যায়। তারা দাবি করেন, ওই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত এখনো জনসমক্ষে আসেনি। এ কারণে নিহতদের পরিবার এবং সহকর্মীদের মধ্যে ক্ষত ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

নুরুল ইসলাম সাদ্দামের বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে সাহসী ও সত্য উচ্চারণ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন, এ ধরনের অভিযোগ আনতে হলে প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যে আবেগের প্রকাশ স্বাভাবিক হলেও দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে কথা বললে তা জনমনে বিভ্রান্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নোয়াখালী জেলা দক্ষিণের সভাপতি হাফেজ সাইফুর রসুল ফুহাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও নোয়াখালী জেলা জামায়াতে আমির ইসহাক খন্দকার এবং নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট ও সদর আংশিক) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা বেলায়েত হোসেন। তারা তাদের বক্তব্যে শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করেন এবং দাবি করেন, অতীতের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ বিচার ও সত্য উদঘাটন না হলে সমাজে ক্ষত থেকে যাবে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘাতের শিকার হয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারগুলো এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তারা মনে করেন, কেবল স্মরণসভা নয়, বরং একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতে যাতে রাজনৈতিক মতভেদের কারণে প্রাণহানি না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

স্থানীয়ভাবে অনুষ্ঠানটি ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে সভা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তবে বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আলোচনা আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যে কোনো হামলা বা সহিংসতার ঘটনায় দোষীদের শনাক্ত করতে হলে আবেগ নয়, বরং তথ্যভিত্তিক তদন্ত জরুরি। তারা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যগুলো যাচাই না করে গ্রহণ করলে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, অতীত ও বর্তমানের সব সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে।

শরিফ ওসমান হাদির প্রসঙ্গ নতুন নয়, তবে শিবির সেক্রেটারি জেনারেলের এই বক্তব্য আবারও তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। একদিকে স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আবেগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় সামনে এসেছে তদন্ত ও জবাবদিহির প্রশ্ন। নোয়াখালীর এই স্মরণসভা তাই শুধু অতীতের একটি দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়নি, বরং বর্তমান সমাজ ও রাজনীতিতে সহিংসতা, দায়বদ্ধতা এবং ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

সবশেষে বলা যায়, এই বক্তব্য ও অনুষ্ঠান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করলেও, সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দায়িত্বশীল অনুসন্ধান, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে সমাজের ক্ষত সারাতে। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অনুষ্ঠিত এই স্মরণসভা সেই চাওয়ার কথাই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত