প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির ওপর নির্মম হত্যাচেষ্টার ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিলেও, এর রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটনাটি নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একটি গুরুতর অপরাধের ন্যায্য বিচার ও দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি যেখানে মুখ্য হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে শুরু হয়েছে বক্তব্যের যুদ্ধ, ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাদা ছোড়াছুড়ি। ফলে মানবিক সহমর্মিতা ও ঐক্যের বদলে রাজনৈতিক বিভাজনই আরও প্রকট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত শুক্রবার বেলা সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাদির অবস্থা এখনো শঙ্কামুক্ত নয় এবং তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। এ ঘটনায় সরকারের বিভিন্ন মহল, রাজনৈতিক দল এবং জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র নিন্দা জানালেও, খুব দ্রুতই পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে মোড় নেয়।
ঘটনার পরপরই রাজনৈতিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে ডাকসু ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েমের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে। হাদির ওপর গুলি চালানোর আনুমানিক ২০ মিনিট পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লেখেন, ওসমান হাদিকে গুলি করা হলো। চাঁদাবাজ ও গ্যাংস্টারদের কবল থেকে ঢাকা সিটিকে মুক্ত করতে অচিরেই আমাদের অভ্যুত্থান শুরু হবে। এই বক্তব্যে ব্যবহৃত ‘চাঁদাবাজ ও গ্যাংস্টার’ শব্দচয়ন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপি নেতাদের একাংশের অভিযোগ, এই ভাষার মাধ্যমে দলটিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
এর মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে লেখেন, কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা মতভিন্নতার কারণে এ ধরনের সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও বক্তব্যটি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করেনি, তবুও বিএনপির পক্ষ থেকে এটিকে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের মধ্যে বাকযুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এই উত্তেজনার বাস্তব রূপ দেখা যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে। আহত হাদিকে দেখতে সেখানে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের দলীয় মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাস। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তিনি সেখানে পৌঁছানোর পরই একদল লোক ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে শুরু করে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কেউ কেউ তার দিকে তেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং মির্জা আব্বাসকে নিরাপত্তা দিয়ে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যান।
এই ঘটনার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, মির্জা আব্বাস সহানুভূতি জানাতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সেখানে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং একটি মব তৈরির চেষ্টা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিএনপির ওপর আঘাত এলে দল বসে থাকবে না এবং কীভাবে জবাব দিতে হয় তা বিএনপি জানে। এই বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দেয় বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
পরদিন নয়াপল্টনে ওসমান হাদি ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর ওপর হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে মির্জা আব্বাস আরও কঠোর ভাষায় কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, হাদিকে গুলি করার মাধ্যমে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা চলছে। তিনি ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের ফেসবুক পোস্টের সময় উল্লেখ করে বলেন, হাদির গায়ে গুলি লাগে বেলা সোয়া ২টায় এবং ঠিক আড়াইটার সময় এমন একটি পোস্ট আসে, যেখানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তার মতে, এটি পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
সমাবেশে হাসপাতালের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মির্জা আব্বাস বলেন, তিনি রাজপথের আন্দোলন থেকে উঠে আসা মানুষ এবং ওই মুহূর্তে সংযম দেখিয়েছেন। তার দাবি, যদি তিনি সেদিন পাল্টা নির্দেশ দিতেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারত। তিনি আরও বলেন, যারা হাসপাতালে আক্রমণাত্মক স্লোগান দিয়েছে তারা ওসমান হাদির প্রকৃত সমর্থক নয়, বরং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি দাবি করেন, হামলাটি সুপরিকল্পিত এবং যাকে হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সেই ব্যক্তির সঙ্গে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ রয়েছে। একপর্যায়ে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারের বরাতে একটি বক্তব্য উল্লেখ করেন, যেখানে হামলাকারীর সঙ্গে সাদিক কায়েমের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
তবে এই বক্তব্যের পরপরই ঢাকা মহানগর পুলিশ তা সম্পূর্ণ ভুয়া বলে অস্বীকার করে। ডিএমপি জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই বক্তব্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিষয়টি সামনে আসার পর সাদিক কায়েম ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে রিজভীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানানো হয় এবং প্রকাশ্যে তা প্রত্যাহারের দাবি ওঠে।
সাদিক কায়েম ফেসবুকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আওয়ামী প্রোপাগান্ডা সেল কর্তৃক প্রচারিত এআই-জেনারেটেড ছবি ও ভুয়া তথ্য যাচাই না করেই বিএনপির সিনিয়র নেতা তাকে হত্যাচেষ্টাকারীর সঙ্গে জড়িয়ে অপতথ্য ছড়িয়েছেন, যা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। তিনি বিএনপি ও রিজভীর কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন বক্তব্য দেওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারবিরোধী।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কার মধ্যে শেষ পর্যন্ত রাতে রুহুল কবির রিজভী তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এআই-জেনারেটেড ছবি ও ভুয়া তথ্য যাচাই না করেই তিনি বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং এটি তার অনিচ্ছাকৃত ভুল। এ জন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন।
হাদির ওপর হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই পুরো রাজনৈতিক টানাপোড়েন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সহনশীলতা নিয়ে। অনেকেই মনে করছেন, একটি মানবিক সংকটের মুহূর্তে রাজনৈতিক সংযম ও ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজনমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত ছিল দ্রুত তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। কিন্তু রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ সেই মূল দাবি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দিয়েছে।
এখনো হাসপাতালে শয্যাশায়ী শরীফ ওসমান হাদির জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলছে। তার পরিবার, সহকর্মী ও সমর্থকরা উৎকণ্ঠার সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, সহিংস রাজনীতির এই চক্র থেকে বেরিয়ে এসে মানবিকতা ও আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না। হাদির হত্যাচেষ্টার বিচার কেবল একজন রাজনীতিবিদের জন্য নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।