প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তোলা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। এই ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক হিসেবে শনাক্ত হওয়া আব্দুল হান্নানকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও পূর্বপরিচিতদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, হান্নানকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করলে হামলার মূল পরিকল্পনা ও সন্দেহভাজনদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
রোববার সকালে র্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক আব্দুল হান্নানকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাকে পল্টন থানায় হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মোটরসাইকেলটির মালিক কেবলই কি একজন নিরীহ শ্রমিক, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো যোগসূত্র।
র্যাবের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, আব্দুল হান্নান বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় বসবাস করেন। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা অনুযায়ী, গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা পশ্চিমপাড়ায়। তার বাবা মো. আবুল কাশেম ও মা মোসা. ফুরকোন। পেশাগতভাবে তিনি নিজেকে শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়মিত পেশার তথ্য পাওয়া যায়নি।
হান্নানকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ ও অনলাইন সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর শনাক্ত করা হয়। নম্বরটি ছিল ঢাকা মেট্রো-ল-৫৪-৬৩৭৫। এরপর বিআরটিএর ডাটাবেজ যাচাই করে দেখা যায়, মোটরসাইকেলটির নিবন্ধিত মালিক মো. আব্দুল হান্নান।
র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হান্নানের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, মোটরসাইকেলটি তিনি আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার অন্য সময় বলেন, বাইকটি নাকি একটি গ্যারেজে ছিল। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে তিনি কোনো লিখিত দলিল, বিক্রির রসিদ কিংবা গ্যারেজে রাখার প্রমাণ দেখাতে পারেননি। ফলে তার বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তদন্তকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হান্নানের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সালকে ঘিরে। তিনি স্বীকার করেছেন যে, ফয়সাল তার পূর্বপরিচিত। তবে একই সঙ্গে দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু র্যাব কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে পাওয়া তথ্য বলছে ফয়সাল তার ঘনিষ্ঠজনদের একজন এবং তাদের মধ্যে সম্পর্ক একেবারে বিচ্ছিন্ন ছিল—এমন দাবি পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, হান্নানের কাছ থেকে ফয়সালের বর্তমান অবস্থান, চলাফেরা এবং হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এ কারণেই তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আটক দেখিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, যাতে তদন্ত কর্মকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন।
এই ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপটও দেশের রাজনীতিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। প্রকাশ্যে সংঘটিত এই হামলা নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। হামলার পরপরই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর অবস্থার অবনতি আশঙ্কায় ওই রাতেই তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে স্থানান্তর করা হয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, তিনি এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসকেরা নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন।
হাদির ওপর হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই এটিকে নির্বাচনের আগে ভয়ভীতি সৃষ্টি ও রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এসব ভিডিও ও ছবি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে মোটরসাইকেলের মালিক গ্রেপ্তারের পর প্রশ্ন উঠেছে, হামলার পরিকল্পনায় কি আরও কেউ জড়িত ছিল, নাকি এটি ছিল একটি সংগঠিত চক্রের অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের হামলায় সাধারণত একাধিক স্তরের পরিকল্পনা ও সহযোগিতা থাকে। মোটরসাইকেলটির মালিকানা, চালকের পরিচয় এবং গুলিবর্ষণকারীর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
র্যাব ও পুলিশ সূত্র বলছে, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, কল ডিটেইলস রেকর্ড, অবস্থানগত তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলাচলের ইতিহাস যাচাই করে হামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহ চেইনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হান্নানকে ঘিরে উদ্ভূত প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে কেবল একটি হামলার রহস্যই উন্মোচিত হবে না, বরং নির্বাচনের আগে সহিংসতার পেছনের বড় চিত্রও স্পষ্ট হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনার পর রাজধানীর রাজনীতিতে নিরাপত্তা ইস্যু নতুন করে সামনে এসেছে। প্রার্থীদের প্রচারণা, জনসভা ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশ্বস্ত করেছে, হামলার তদন্তে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হবে না এবং দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, বাইকমালিক হান্নানকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করা হলেও হামলার পূর্ণ রহস্য উদঘাটনে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। তার দেওয়া বক্তব্য, প্রমাণের অভাব এবং পূর্বপরিচিতদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিবিড় অনুসন্ধানের কেন্দ্রে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।










