মস্তিষ্কে অক্সিজেন সংকটে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে হাদি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৪ বার
হাদির শারীরিক অবস্থার উন্নতি, স্থিতিশীল স্বাস্থ্য রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মস্তিষ্কে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও আশঙ্কাজনক করে তুলেছে। সর্বশেষ চিকিৎসা মূল্যায়নে জানানো হয়েছে, ক্লিনিক্যালভাবে এখনো কোনো ইতিবাচক উন্নতির লক্ষণ নেই এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

রোববার বেলা ১২টার দিকে হাদির চিকিৎসার জন্য গঠিত ১৩ সদস্যের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড বৈঠকে বসে। বোর্ডের সব সদস্য উপস্থিত থেকে রোগীর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা, বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেন। বৈঠক শেষে চিকিৎসকরা একমত হন যে, হাদির অবস্থা এখনো অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং মস্তিষ্কজনিত জটিলতাই এই মুহূর্তে প্রধান উদ্বেগের বিষয়।

মেডিকেল বোর্ডের প্রধান, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জাফর ইকবালের বরাত দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিউরোসার্জারি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আব্দুল আহাদ গণমাধ্যমকে জানান, হাদির সর্বশেষ সিটি স্ক্যান রিপোর্ট অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, নতুন করে করা স্ক্যানে দেখা গেছে, মস্তিষ্কে অক্সিজেন স্বল্পতা রয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষরণের চিহ্নও বিদ্যমান। এর অর্থ হলো, মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি।

ডা. আহাদ আরও জানান, ফুসফুসের অবস্থা আগের মতোই রয়েছে এবং লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখা হয়েছে। কিডনি কার্যক্রম আপাতত স্বাভাবিক থাকলেও মূল সংকট মস্তিষ্ককে ঘিরেই। চিকিৎসকদের মতে, অক্সিজেন স্বল্পতা দীর্ঘস্থায়ী হলে মস্তিষ্কের কোষে স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে, যা রোগীর ভবিষ্যৎ সুস্থতার সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

হাদির ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে তার শারীরিক অবস্থা ঘিরে দেশজুড়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। গত শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ শেষে তিনি রিকশায় করে গন্তব্যে ফিরছিলেন। রাজধানীর বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় পৌঁছালে পেছন দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল থেকে খুব কাছ থেকে তার মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে মুহূর্তের মধ্যে এবং হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

গুলিটি হাদির মাথার ডান পাশ দিয়ে প্রবেশ করে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়, যা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গুরুতর আহত করে। আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকরা তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানান। উন্নত চিকিৎসার আশায় একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

হামলার পর থেকে হাদি কার্যত অচেতন অবস্থায় রয়েছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট আঘাত ও পরবর্তী জটিলতাই তার বর্তমান অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন আঘাতের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থা পরিবর্তিত হতে পারে, তবে অক্সিজেন স্বল্পতা যুক্ত হলে ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।

হাদির শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত আরোগ্য কামনা করে বিবৃতি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য মানুষ তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন এবং একই সঙ্গে হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হাদির চিকিৎসায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানের প্রোটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির সহায়তায় তার শারীরিক সূচকগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে চিকিৎসকরাও স্বীকার করছেন, মস্তিষ্কের বর্তমান অবস্থার কারণে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

এদিকে হামলার ঘটনার তদন্তও এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত এবং এর মালিককে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, যা তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনী পরিবেশে এ ধরনের সহিংস ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলে না, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই হাদির চিকিৎসার পাশাপাশি এই ঘটনার পেছনের কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হাদির পরিবার ও সহকর্মীরা কঠিন সময় পার করছেন। হাসপাতালের বাইরে স্বজনদের উৎকণ্ঠিত অপেক্ষা এবং সমর্থকদের নীরব প্রার্থনা পুরো পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে। চিকিৎসকদের পরবর্তী মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণের ওপরই নির্ভর করছে হাদির জীবনের পরবর্তী অধ্যায়।

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, শরিফ ওসমান হাদি এখনো লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন এবং তার অবস্থা আশঙ্কাজনকই রয়েছে। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, আর দেশবাসী তাকিয়ে আছে একটি ইতিবাচক খবরের আশায়—যে খবর হয়তো এই অন্ধকার সময়ের মধ্যে কিছুটা আলো এনে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত