কড়া নিরাপত্তায় উৎসবমুখর জকসু ভোটগ্রহণ শুরু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৭ বার
কড়া নিরাপত্তায় উৎসবমুখর জকসু ভোটগ্রহণ শুরু

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে শুরু হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ, জকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। মঙ্গলবার সকাল ৯টার পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা চলবে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। নির্বাচনের দিন শুরু হতেই ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ, একই সঙ্গে লক্ষ্য করা গেছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত উপস্থিতিতে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি ও আগ্রহ—দুটোই চোখে পড়েছে।

সকাল ৮টার দিকে সরেজমিনে ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথগুলোতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরিচয় যাচাই ও শৃঙ্খলাবদ্ধ লাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। প্রধান সড়ক ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা টহল দেখা যায়। ক্যাম্পাসের ভেতরে ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ লাইন, হাসি-আড্ডা ও নানা প্যানেলের প্রচার কার্যক্রম মিলিয়ে এক ধরনের উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের জকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৮ হাজার ৪৭৯ জন এবং পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ১৭০ জন। কেন্দ্রীয় সংসদ ও বিভিন্ন হল সংসদ মিলিয়ে মোট প্রার্থী রয়েছেন ১৯০ জন। কমিশন সূত্র জানায়, ভোটগ্রহণের জন্য মোট ৩৯টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং এসব কেন্দ্রে ১৭৮টি বুথ বসানো হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য ৩৮টি কেন্দ্র এবং একটি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে হল সংসদের জন্য।

ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা নির্ধারিত সময়ের আগেই উপস্থিত ছিলেন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, সিল, ব্যালট বাক্সসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করছেন এবং সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করছেন। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটগ্রহণে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রতিনিধিত্ব সংকট। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত জকসু নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিনিধিত্বহীন অবস্থায় ছিল। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার, একাডেমিক ও আবাসনসংক্রান্ত সমস্যা এবং সার্বিক ক্যাম্পাস জীবন নিয়ে সংগঠিতভাবে কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে। অনেক শিক্ষার্থী জানান, তারা কেবল দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রার্থীদের কর্মসূচি, অতীত ভূমিকা ও শিক্ষার্থীবান্ধব অবস্থান বিবেচনা করেই ভোট দেবেন।

ভোটকেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকেই বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। তারা ভোটারদের স্বাগত জানাচ্ছেন, শেষবারের মতো ভোট ও দোয়া চাইছেন। কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে স্লোগান ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্যও দেখা যায়। তবে নির্বাচন কমিশন ও প্রক্টরিয়াল টিমের নির্দেশনায় এসব কার্যক্রম নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ভোটগ্রহণে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক বলেন, সার্বিক নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং ভোটগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বজায় থাকবে। তিনি জানান, ক্যাম্পাসে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করছে। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নির্বাচন উপলক্ষে ক্যাম্পাসের ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম সীমিত রাখা হয়েছে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। অনেক শিক্ষার্থী সকালে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে এসে ভোট দিয়েছেন এবং ভোটকেন্দ্রের বাইরে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন, এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পথে নতুন যাত্রার সূচনা। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, জকসু কার্যকর হলে প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের পথ আরও সুগম হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখান থেকেই অনেক সময় ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি হয়। সে কারণে জকসু নির্বাচন শুধু একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক আয়োজন নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ বিরতির পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জকসু নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীরা ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ তুলে ধরছেন। অনেকেই শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ভোটগ্রহণের দৃশ্য দেখে সন্তোষ প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসা করছেন। তবে কিছু শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে জকসুকে আরও কার্যকর ও নিয়মিত করার দাবি তুলেছেন।

নির্বাচন কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গণনা সম্পন্ন করে ফলাফল ঘোষণা করার প্রস্তুতি রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে সন্ধ্যার মধ্যেই প্রাথমিক ফল প্রকাশ করা হতে পারে। কমিশন আশা প্রকাশ করেছে, শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে।

সব মিলিয়ে, কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া জকসু নির্বাচন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নেতৃত্ব কতটা কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত