প্রকাশ: ৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে আবারও সহিংসতা ও নিরাপত্তা শঙ্কার ঘটনা সামনে এসেছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের এক বহিরাগত কর্মী দা হাতে ছাত্রাবাসে ঢুকে হামলার চেষ্টা চালানোর অভিযোগে আটক হয়েছেন আতঙ্ক বিপ্লব ওরফে বিপ্লব নামে এক ব্যক্তি। বুধবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে শাহ আমানত হলকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে, যা মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। শিক্ষার্থীদের তৎপরতায় তাকে আটক করে প্রথমে প্রক্টোরিয়াল বডির হেফাজতে নেওয়া হয়, পরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটির সূত্রপাত মোবাইল ফোন কেনাবেচা সংক্রান্ত এক আর্থিক বিরোধ থেকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে অভিযুক্ত বিপ্লবের মোবাইল ফোন লেনদেন হয়েছিল। ফোন ফেরত দেওয়ার টাকা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। যদিও পরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার সিদ্ধান্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাবেদের উদ্যোগে সমঝোতার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের শাহ আমানত হলে ডাকা হয়।
বিপ্লবের বাবা ওই হলের বাবুর্চি হওয়ায় সেখানে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। শুরুতে বিপ্লব সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে পরে হলে এসে বাবার জড়িত থাকার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি দা হাতে নিয়ে হলের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং মোবাইল ফোনের ক্রেতা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার চেষ্টা চালান।
হঠাৎ করে দা হাতে এক বহিরাগতকে হলে ঢুকতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। অনেকেই প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি। তবে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করলে শিক্ষার্থীরাই সাহসিকতার সঙ্গে তাকে ঘিরে ধরে আটক করেন। পরে খবর দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডিকে। প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে বিপ্লবকে উদ্ধার করে নিরাপত্তা দফতরে নিয়ে যান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির সময় অভিযুক্তের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা হয়। সেখানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়। একই সঙ্গে জানা যায়, অভিযুক্ত বিপ্লব এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পূর্বপরিচয় রয়েছে এবং অতীতে তারা একসঙ্গে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই তথ্য সামনে আসার পর ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায় এবং ক্যাম্পাস রাজনীতির পুরোনো ক্ষত আবারও আলোচনায় আসে।
আটক আতঙ্ক বিপ্লব সম্পর্কে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ‘আইএসএস’-এর একজন কর্মী। অর্থাৎ, যিনি নিজেই ক্যাম্পাস নিরাপত্তার অংশ হওয়ার কথা, তার হাতেই অস্ত্র এবং তার বিরুদ্ধেই সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। এই তথ্য প্রকাশের পর শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এমন একজন ব্যক্তি কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন এবং তার বিরুদ্ধে আগে কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, বিপ্লবকে ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরেই ‘আতঙ্ক বিপ্লব’ নামে ডাকা হতো। তার আচরণ ও চলাফেরা নিয়ে আগেও নানা অভিযোগ ছিল। তবে কোনো কারণে সেগুলো গুরুত্ব পায়নি। বুধবারের ঘটনা সেই অবহেলার ফল বলে মনে করছেন অনেকে। তারা বলছেন, যদি আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, কীভাবে একজন বহিরাগত ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হলে প্রবেশ করল এবং দা বহন করল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আউটসোর্সিং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও নিয়োগ প্রক্রিয়াও পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রক্টর অফিসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের অস্ত্র বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দা হাতে হলে প্রবেশ করা গুরুতর অপরাধ। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। অভিযুক্তের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের চুক্তি ও দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, হলে থাকা অবস্থায় তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অস্ত্র নিয়ে চলাচল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। তারা দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। নেতারা বলেন, যে কোনো ধরনের সহিংসতা ও অস্ত্র প্রদর্শন শিক্ষাঙ্গনে অগ্রহণযোগ্য। নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এখনও বিভিন্নভাবে সক্রিয় রয়েছে—এই ঘটনা তার প্রমাণ। প্রশাসনকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে, পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ হামলার চেষ্টার অভিযোগে মামলা প্রক্রিয়াধীন। প্রাথমিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নাজুক। নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মী হয়েও কেউ যদি দা হাতে ছাত্রাবাসে ঢুকে হামলার চেষ্টা করতে পারে, তবে সেটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিফলন। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিলেই চলবে না, বরং ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, আউটসোর্সিং নিরাপত্তা কর্মীদের যাচাই-বাছাই এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ। শিক্ষার্থীদের আশা, এই ঘটনা যেন আরেকটি ভুলে যাওয়া অধ্যায়ে পরিণত না হয়, বরং ক্যাম্পাসে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে।