দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলন

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতের বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ রূপকল্প নির্ধারণে ঢাকায় শুরু হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্মেলন। ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা–২০২৬’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী এই দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর অভিজাত হোটেল লা মেরিডিয়ানে আয়োজিত সম্মেলনে তিনি উপস্থিত হন। তার অংশগ্রহণে সম্মেলনটি শুধু একটি শিক্ষাবিষয়ক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উচ্চশিক্ষাকে মানব উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। শিক্ষা যদি কেবল সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সমাজ ও অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। শিক্ষাকে হতে হবে উদ্ভাবন, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বিত রূপ।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই সম্মেলনে যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিসহ মোট ৩০ জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করছেন। দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে এই সম্মেলন উচ্চশিক্ষা খাতে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

সম্মেলনের আয়োজকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইউজিসি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্পের আওতায় এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে গতি আনা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা। সম্মেলনে আলোচনার মাধ্যমে এই প্রকল্পের অগ্রগতি, সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হচ্ছে।

শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ হলেও মান, গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সম্মেলনে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষার প্রসার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে মতবিনিময় করা হচ্ছে।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ দেশের উচ্চশিক্ষা সংস্কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিরা গবেষণা ও শিল্পখাতের সংযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, মালয়েশিয়া ও নেপালের প্রতিনিধিরা শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কথা বলেছেন। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিরা আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার বক্তব্যে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য, সামাজিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ অনেকটাই একরকম। তাই উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে তা সবার জন্য লাভজনক হবে। যৌথ গবেষণা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময়, এবং জ্ঞান ভাগাভাগির মাধ্যমে এই অঞ্চল বিশ্ব জ্ঞান অর্থনীতিতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উচ্চশিক্ষায় সমতা ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি। গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নারী শিক্ষার্থীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা মনে করছেন, কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করাও উচ্চশিক্ষা সংস্কারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো মানে ভবিষ্যতের মানবসম্পদে বিনিয়োগ করা। গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, শিল্পখাত শক্তিশালী হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি লাভবান হবে। তারা হিট প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে যে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন।

সম্মেলন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আগ্রহ দেখা গেছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে যুক্ত করতে সহায়ক হবে। শিক্ষক ও গবেষকরাও আশা প্রকাশ করেছেন, সম্মেলনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে গবেষণার সুযোগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়বে।

তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনের শেষ দিনে একটি সমন্বিত ঘোষণাপত্র প্রকাশের কথা রয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, নীতিগত সুপারিশ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হবে। আয়োজকরা আশা করছেন, এই ঘোষণাপত্র সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে।

সব মিলিয়ে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; বরং এটি অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনা সম্মেলনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি মানবিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়েই সম্মেলনের আলোচনা এগিয়ে চলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত