৮২ লাখ মাদকসেবী, চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছে ৮৭ শতাংশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
৮২ লাখ মাদকসেবী, চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছে ৮৭ শতাংশ

প্রকাশ:  ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে মাদক সমস্যা যে দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে এক বা একাধিক ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন প্রায় ৮২ লাখ মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তবে এই বিপুল সংখ্যক মাদকসেবীর মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবার আওতায় এসেছেন। অর্থাৎ দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ মাদকসেবীই এখনো রয়ে গেছেন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বাইরে, যা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই তথ্য প্রকাশ করা হয় গত রোববার রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। সেখানে ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশের আট বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলার পাঁচ হাজার ২৮০ জন মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিমাণগত ও গুণগত— উভয় গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে এই সমীক্ষা করা হয়েছে, যা একে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক করেছে।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মাদক ব্যবহারকারীদের বড় অংশই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি মাদকসেবী একাধিকবার মাদক ত্যাগের উদ্যোগ নিলেও পর্যাপ্ত ও মানসম্মত চিকিৎসা, নিয়মিত কাউন্সেলিং, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আর্থিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশই সেই চেষ্টা ধরে রাখতে পারেননি। ফলে তারা আবারও মাদকের চক্রে ফিরে গেছেন। এই বাস্তবতা দেশের পুনর্বাসন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মোট মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা আট থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যেই প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন। আরও ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথমবার মাদক গ্রহণ করেন। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ খুব অল্প বয়সেই মাদকের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বয়সটাই জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়, যখন ভুল সিদ্ধান্ত ও খারাপ অভ্যাস ভবিষ্যৎকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এখানে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে মাদক ব্যবহারকারী প্রায় ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন। এরপর রয়েছে রংপুর বিভাগ, যেখানে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন। তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম মাদক ব্যবহারকারী পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে— প্রায় চার লাখ চার হাজার ১১৮ জন। তবে গবেষকরা বলছেন, সংখ্যার পার্থক্য থাকলেও দেশের কোনো অঞ্চলই মাদক সমস্যার বাইরে নেই।

মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যা ব্যবহার করেন প্রায় ৬১ লাখ মানুষ। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন, যার ব্যবহারকারী প্রায় ২৩ লাখ। অ্যালকোহল ব্যবহার করেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। এ ছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

গবেষণার প্রধান গবেষক এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীরা এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সিসহ নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, এর মাধ্যমে পুরো সমাজও সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই এই গোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা জরুরি।

গবেষকরা আরও জানান, মাদক সমস্যা এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়। যদিও শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, তবে গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। গবেষণায় মাদক ব্যবহারের পেছনে প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা এবং মানসিক চাপ। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক তাদের জন্য সহজলভ্য, যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, মাদক সমস্যার সমাধানে শুধু সরবরাহ কমালেই হবে না, চাহিদাও কমাতে হবে। শিশু ও তরুণদের মাদকাসক্তির ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, বর্তমান বাস্তবতা হলো দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলন এবং এক ধরনের সামাজিক যুদ্ধ। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার জরুরি। তিনি বলেন, এটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই যে কেবল কিছু খারাপ মানুষই মাদকাসক্ত হয়। বাস্তবে আমরা সবাই এবং আমাদের সন্তানরাও মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছি। এই বাস্তবতা স্বীকার করেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, কো-ইনভেস্টিগেটর অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম, ফোরকান হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বক্তারা সবাই একমত হন যে, গবেষণার এই ফলাফল নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সচেতনতা ও সামাজিক সহায়তা— এই চারটি স্তম্ভকে শক্তিশালী না করলে মাদক সমস্যার ভয়াবহতা আরও বাড়বে।

সব মিলিয়ে গবেষণাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, দেশে মাদক সমস্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক ব্যাধি নয়; এটি একটি ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সংকট। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বাইরে থাকা ৮৭ শতাংশ মাদকসেবীকে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত