লাইটার জাহাজ সংকটে সাগরে ভাসছে ৪৬ জাহাজের ভোগ্যপণ্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬০ বার
লাইটার জাহাজ সংকটে সাগরে ভাসছে ৪৬ জাহাজের ভোগ্যপণ্য

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রমজানকে সামনে রেখে দেশে ভোগ্যপণ্যের আমদানি প্রতিবছরই বাড়ে। তবে চলতি বছর সেই আমদানির চিত্র অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। খাদ্যশস্য, ডাল, তৈলবীজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে একদিকে যেমন স্বস্তির বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একের পর এক জাহাজ ভিড়লেও সেগুলো থেকে পণ্য দ্রুত খালাস ও দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লাইটার জাহাজের ঘাটতি। ফলে সাগরে ভাসমান অবস্থায় আটকে আছে ৪৬টি ভোগ্যপণ্যবাহী জাহাজ, যেগুলোতে মোট পণ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ টন।

বন্দর ও নৌপরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছর সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে গম। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রমজানের চাহিদা মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই ব্যাপকভাবে গম আমদানি করা হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে ২৫টি জাহাজে সাড়ে ১৩ লাখ টনের বেশি গম রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার টন ইতোমধ্যে খালাস করা হলেও বাকি অংশ এখনও বড় জাহাজেই রয়ে গেছে। খালাসের গতি মন্থর হওয়ায় এসব জাহাজ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় বহির্নোঙরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে।

গমের পাশাপাশি ডালজাতীয় পণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ছোলা, মসুর ও মটর ডালবাহী ৭টি জাহাজে এসেছে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার টন পণ্য। এর মধ্যে এক লাখ টনের মতো খালাস করা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে ৯টি জাহাজে আমদানি হওয়া ৪ লাখ ৩৯ হাজার টন তৈলবীজের মধ্যে আড়াই লাখ টন খালাস হলেও বাকি অংশ এখনও জাহাজেই রয়েছে। এসব পণ্য দ্রুত বাজারে না পৌঁছালে রমজানে দাম বাড়ার আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বড় জাহাজ থেকে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন ভোগ্যপণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এরপর এসব লাইটার জাহাজ নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে পণ্য পৌঁছে দেয়। কিন্তু আমদানির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যবস্থায় এখন চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে লাইটার জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে।

বন্দরসংশ্লিষ্টরা জানান, এবার ভোগ্যপণ্য আমদানিতে অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা বড় অঙ্কে পণ্য আমদানি করলেও এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশের নিজস্ব গুদাম ও সংরক্ষণ সুবিধা নেই। ফলে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য ওঠানোর পর ঘাটে দ্রুত খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে লাইটার জাহাজগুলো দিনের পর দিন আটকে থাকছে এবং নতুন জাহাজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের গত মঙ্গলবারের তথ্যে দেখা যায়, বহির্নোঙরে অবস্থানরত ১০৪টি পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে ৪৬টিতেই ছিল ভোগ্যপণ্য। এসব জাহাজে মোট ভোগ্যপণ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার টন। গত বছর একই সময়ে বন্দরে ভোগ্যপণ্যবাহী জাহাজ ছিল ২৬টি এবং মোট পণ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ লাখ টন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জাহাজের সংখ্যা ও আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বন্দরের প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত এসব জাহাজ থেকে সাড়ে ১০ লাখ টন ভোগ্যপণ্য খালাস করা হয়েছে। তবে এখনও প্রায় পৌনে ১৩ লাখ টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ পণ্য দ্রুত খালাস করা না গেলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, আমদানি বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় লাইটার জাহাজের সংখ্যা কমে গেছে। পাশাপাশি দেশের অনেক ঘাটেই আধুনিক খালাসব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য খালাসের জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, হঠাৎ করে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় লাইটার জাহাজের চাহিদা অনেক গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের আওতায় আগে যেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০টি লাইটার জাহাজ নিবন্ধিত ছিল, বর্তমানে তা কমে ১ হাজার ২২টিতে নেমে এসেছে। পুরোনো জাহাজ বাতিল হওয়া, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং আর্থিক সংকটের কারণে নতুন জাহাজ যুক্ত না হওয়ায় এই ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে।

লাইটার জাহাজ বরাদ্দের সঙ্গে যুক্ত পরিবহন এজেন্টদের ভাষ্যেও উঠে এসেছে বাস্তব সংকটের চিত্র। এমএসটি মেরিন এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, যেসব আমদানিকারকের নিজস্ব গুদাম নেই, তারা লাইটার জাহাজ থেকে দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারছেন না। এতে একটি জাহাজ দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় নতুন জাহাজের জন্য বরাদ্দ পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ঘাটে এখনও সনাতন পদ্ধতিতে পণ্য খালাস করা হয়, ফলে সময়ও বেশি লাগে।

অন্যদিকে বড় শিল্পগ্রুপগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি গ্রুপ ও আকিজ রিসোর্স গ্রুপের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লাইটার জাহাজ ও আধুনিক ঘাট রয়েছে। ক্রেনের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস করায় এসব গ্রুপের লাইটার জাহাজ এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই খালি করা সম্ভব হয়। ফলে তারা তুলনামূলকভাবে সংকট সামাল দিতে পারছে।

তবে সব বড় গ্রুপই যে স্বস্তিতে রয়েছে, তা নয়। যেসব বড় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লাইটার জাহাজ নেই বা সংখ্যা কম, তারাও এই সংকটে পড়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এমভি টেলেরিগ জাহাজ থেকে গম খালাসের ঘটনা উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। আমদানিকারক এস এস ট্রেডিংয়ের অনুকূলে ‘শুভরাজ–৮’ নামের একটি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয় ১১ ডিসেম্বর। প্রায় দুই হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজটি নারায়ণগঞ্জের একটি ঘাটে নেওয়া হলেও দেড় মাসের বেশি সময়েও সেখান থেকে গম খালাস শেষ হয়নি।

ডব্লিউটিসিসির ২৫ জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ দিন থেকে দেড় মাস ধরে দেশের বিভিন্ন ঘাটে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আটকে আছে ২৬৫টি লাইটার জাহাজ। এর মধ্যে ভোগ্যপণ্যবাহী লাইটার জাহাজের সংখ্যা ১২২টি। শুধু এস এস ট্রেডিংয়েরই এক থেকে দেড় মাস ধরে ১৩টি লাইটার জাহাজ নারায়ণগঞ্জ, নোয়াপাড়া ও কাঁচপুর ঘাটে আটকে রয়েছে। একইভাবে এন মোহাম্মদ, আকিজ গ্রুপ, বিশ্বাস গ্রুপ ও মদিনা ট্রেডিংয়ের আমদানি করা ভোগ্যপণ্যবাহী লাইটার জাহাজও বিভিন্ন ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘাটে শ্রমিকসংকট, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে সাধারণ ভোক্তার ওপর। রমজানের আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে দ্রুত লাইটার জাহাজের সংকট নিরসন, ঘাটে আধুনিক খালাসব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং আমদানিকারকদের পণ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি। তা না হলে সাগরে ভাসমান পণ্যের এই চাপ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত