প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ খাদ্যপণ্যের প্রদর্শনী গালফ ফুড ফেয়ার–২০২৬ এ বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার শক্ত উপস্থিতি জানান দিয়েছে প্রাণ গ্রুপ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিয়ে প্রাণ পেয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্রয়াদেশ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৭ কোটি ১০ লাখ টাকার সমান। দেশের খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এই সাফল্যকে শিল্পসংশ্লিষ্টরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
প্রাণ গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, এবারের গালফ ফুড ফেয়ারে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়াসহ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বিস্কুট, নুডলস, জুস ও অন্যান্য বেভারেজ, কনফেকশনারি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের চাহিদা ছিল চোখে পড়ার মতো। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি খাদ্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা যে ক্রমেই বাড়ছে, এই ক্রয়াদেশ তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের প্রায় ১৯৫টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এবারের গালফ ফুড ফেয়ারে আট হাজারের বেশি স্টলে বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য প্রদর্শন করে। এ বিশাল আয়োজনের মধ্যে প্রাণ গ্রুপ এককভাবে প্রায় ৫০০ ধরনের খাদ্যপণ্য প্রদর্শন করেছে। দেশীয় ফল ও কৃষিজ পণ্যভিত্তিক জুস, আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি বিস্কুট ও বেকারি আইটেম, নুডলস, স্ন্যাকস, মসলা, ফ্রোজেন ফুড এবং রান্নার উপযোগী নানা পণ্য প্রাণের স্টলে স্থান পায়। বৈচিত্র্য, গুণগত মান ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাণ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (রপ্তানি) মিজানুর রহমান বলেন, গালফ ফুড ফেয়ার শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, বরং এটি বৈশ্বিক খাদ্যশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলা। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের উৎপাদনকারী, ডিস্ট্রিবিউটর ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে নতুন পণ্য, প্রযুক্তি ও বাজার প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পান। তিনি জানান, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, সেন্ট্রাল ও সাউথ আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে প্রাণের রপ্তানি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রতিবছর এই মেলায় অংশ নেওয়া হয়। এবারের মেলায় পাওয়া ক্রয়াদেশ সেই কৌশলের সফল বাস্তবায়নের প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাস ও পছন্দ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যপণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। গালফ ফুড ফেয়ারের মতো মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন কাছ থেকে বোঝা যায় এবং সে অনুযায়ী পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়। প্রাণ গ্রুপ সেই লক্ষ্যেই ধারাবাহিকভাবে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে।
প্রাণ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক গোলাম রসুল, যিনি ইউরোপ ও আমেরিকার রপ্তানি কার্যক্রম দেখভাল করেন, জানান যে এবারের মেলায় ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০০ আমদানিকারক প্রাণের স্টল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের স্টলে জুস ও বেভারেজ, বিস্কুট ও বেকারি, স্ন্যাকস, নুডলস, মসলা, কুলিনারি পণ্য এবং ফ্রোজেন ফুড ক্যাটাগরির বিস্তৃত পণ্য প্রদর্শন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিশেষভাবে পণ্যের মান, প্যাকেজিং এবং খাদ্যনিরাপত্তা মানদণ্ডের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য শিল্প এখন কেবল স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। প্রাণ গ্রুপ তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য খাদ্যপণ্য রপ্তানি একটি সম্ভাবনাময় খাত। এই খাতে বড় অঙ্কের রপ্তানি আদেশ পাওয়া মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও এটি আশাব্যঞ্জক।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে প্রাণের পণ্য পৌঁছে দেওয়াই তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। একই সঙ্গে প্রাণকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে গড়ে তুলতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, গালফ ফুড ফেয়ার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এখানে নতুন বাজারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গড়ে ওঠে এবং দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি চুক্তির পথ তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, এবারের মেলায় প্রাণ যে পরিমাণ ক্রয়াদেশ পেয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ক্রেতাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সময়মতো ও মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করতে পারলে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিভিন্ন দেশের আমদানি নীতির কঠোরতার মধ্যেও যদি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের আন্তর্জাতিক মেলায় সাফল্য পায়, তবে তা দেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে এমন সাফল্য অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করতে সহায়ক হবে।
গালফ ফুড ফেয়ার–২০২৬ শেষ হচ্ছে আজ শুক্রবার। পাঁচ দিনের এই আয়োজনে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক সংযোগ প্রাণ গ্রুপের ভবিষ্যৎ রপ্তানি কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই সাফল্য দেশের অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকেও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সক্রিয় হতে অনুপ্রাণিত করবে—এমন প্রত্যাশা শিল্পসংশ্লিষ্টদের।