প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বহুল আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার পোশাক শিল্পে নতুন করে প্রতিযোগিতার হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ আলোচনা ও কূটনৈতিক দেনদরবারের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। দিল্লির প্রত্যাশা, এই চুক্তির মাধ্যমে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কচাপ সামাল দেওয়া যাবে, অন্যদিকে ইউরোপের বিশাল পোশাক বাজারে বাংলাদেশকে সরাসরি প্রতিযোগিতায় ফেলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করা সম্ভব হবে।
গত মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়। ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ভারতের সংসদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন সাপেক্ষে চুক্তিটি ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এই চুক্তিকে ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে দেশটির সরকার ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম।
চুক্তির আওতায় ভারত থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের বাজারে প্রবেশ করা পণ্যের বড় একটি অংশ বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাবে। বিশেষ করে ভারতীয় পোশাকপণ্যের ওপর ইউরোপের বিদ্যমান প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক ধাপে ধাপে শূন্যে নেমে আসবে বলে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক পণ্য, হস্তশিল্প ও গয়নার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে শুল্ক কমানো কিংবা সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। এতে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পণ্যের দাম আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জি নিউজ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, এই চুক্তির ফলে ইউরোপের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের দখলে থাকা বড় একটি অংশ ভারতের হাতে চলে যাওয়ার ব্যাপারে দিল্লি আশাবাদী। প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে ইউরোপের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, ভারত এখন সেই একই সুবিধা পেতে যাচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতার সমীকরণ আমূল বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উত্থান ইউরোপের বাজারকে কেন্দ্র করেই। ১৯৭৫ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এলডিসি বাণিজ্য সুবিধার আওতায় অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পেয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান, যা দেশটির তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি বড় অর্জন। ডেনিম, ট্রাউজার ও টি-শার্টের মতো বেশ কয়েকটি পণ্যে বাংলাদেশ শুধু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকেনি, বরং চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে ইইউতে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এরপর রয়েছে তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশেরও বেশি গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় এক হাজার ৯৭১ কোটি ডলার। এই বিশাল বাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে।
ইইউর সঙ্গে ভারতের নতুন বাণিজ্য চুক্তির পর দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জানিয়েছেন, ভারত খুব দ্রুতই ইউরোপে টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারবে। তার মতে, বর্তমানে ইউরোপে ভারতের টেক্সটাইল রপ্তানি যেখানে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, সেখানে এই চুক্তির সুফল পেলে তা ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, “আমাদের সব সময় জিজ্ঞেস করা হতো, বাংলাদেশ কীভাবে ইউরোপে এত বেশি রপ্তানি করে। তারা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত এবং প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাজার দখল করেছিল। এখন সেই সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে।”
এই বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, বাংলাদেশকে একটি সরাসরি প্রতিযোগী হিসেবেই দেখছে ভারত। জি নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পোশাক রপ্তানি বাড়লে প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং তুলনামূলক উন্নত পণ্যের মানের কারণে বাংলাদেশ চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব পণ্যে দুই দেশের উৎপাদন কাঠামো ও কাঁচামালের ব্যবহার কাছাকাছি, সেখানে মূল্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভারতের এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত। কারণ এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইউরোপের শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারত যদি একই সময়ে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়, তাহলে বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে নেই। গত কয়েক দশকে উৎপাদন দক্ষতা, বড় আকারের কারখানা, অভিজ্ঞ শ্রমশক্তি এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ চেইনের কারণে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছে। এই অবস্থান রাতারাতি বদলে যাবে না বলেও মত তাদের।
তবুও বাস্তবতা হলো, ভারতের মতো বড় অর্থনীতি ও বৈচিত্র্যময় শিল্পভিত্তি নিয়ে ইউরোপের বাজারে আগ্রাসীভাবে প্রবেশ করলে প্রতিযোগিতা যে কঠিন হবে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে নিজেদের পণ্যের মান, বৈচিত্র্য ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে আরও বিনিয়োগ করার একটি সুযোগ।
সব মিলিয়ে, ইইউর সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু দুই পক্ষের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন অধ্যায় নয়, বরং ইউরোপের পোশাক বাজারে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ দক্ষিণ এশিয়ার পোশাক শিল্পে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইউরোপের বাজারকে ঘিরে প্রতিযোগিতা এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।