প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণ ও রুপার বাজারে অস্থিরতা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দামের পরিবর্তনের প্রভাব—সব মিলিয়ে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা যাচ্ছে প্রায় নিয়মিতই। সর্বশেষ সমন্বয়ে দেশের বাজারে আবারও বড় ব্যবধানে বাড়ানো হয়েছে স্বর্ণের দাম। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি হচ্ছে সর্বশেষ নির্ধারিত উচ্চ দামে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বর্ণের নতুন দর ঘোষণা করে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এই এক দফা সিদ্ধান্তেই ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছে ১০ হাজার ৯০৬ টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় সমন্বয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই সমন্বয়ের পর দেশের বাজারে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকায়। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা। ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ভরিপ্রতি ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৪৩ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হয়েছে ভরিপ্রতি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৮৫ টাকা। এসব দাম দেশের সব জুয়েলারি দোকানে কার্যকর রয়েছে, যদিও এর সঙ্গে গহনার মজুরি ও ভ্যাট যুক্ত হলে ক্রেতাদের খরচ আরও বাড়ছে।
চলতি বছরে স্বর্ণের দামের এমন ঊর্ধ্বগতি অনেক ক্রেতাকেই হতাশ করেছে। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুম বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য যারা গহনা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য স্বর্ণের এই বাড়তি দাম বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দাম বাড়ার পর দোকানে ক্রেতার সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কেনার আগ্রহ এখনো পুরোপুরি কমেনি। অনেকেই ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় সীমিত পরিমাণে হলেও স্বর্ণ কিনছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে ২৪ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং কমানো হয়েছে ৮ বার। অর্থাৎ পুরো বছরজুড়েই দাম বাড়ানোর প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। আগের বছর ২০২৫ সালেও স্বর্ণের বাজার ছিল বেশ অস্থির। সে বছর মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয় এবং ২৯ বার কমানো হয়। এত ঘন ঘন দামের পরিবর্তন দেশের স্বর্ণবাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্বর্ণের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই মঙ্গলবার দেশের বাজারে রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। ভরিপ্রতি রুপার দাম এক দফায় বাড়ানো হয় ১৭৫ টাকা। ফলে বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৫৩২ টাকায়। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৪০ টাকা। ১৮ ক্যারেটের রুপা বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৩৬৫ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ভরিপ্রতি ৪ হাজার ২৪ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
রুপার ক্ষেত্রেও চলতি বছরে একাধিকবার দামের সমন্বয় করা হয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ১৬ দফা রুপার দাম সমন্বয় হয়েছে, যার মধ্যে ১০ বার দাম বেড়েছে এবং ৬ বার কমেছে। আগের বছর ২০২৫ সালে রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল মোট ১৩ বার। সে বছর ১০ বার দাম বেড়েছিল এবং মাত্র ৩ বার কমেছিল। অর্থাৎ স্বর্ণের মতো রুপার বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও সরাসরি প্রভাব পড়ে। ডলার সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ছে। এর প্রভাব এড়ানো যাচ্ছে না দেশের বাজারেও। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি, শুল্ক ও কর কাঠামো এবং আমদানিজনিত ব্যয়ও স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে রুপার দাম বাড়ার পেছনেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব রয়েছে। শিল্পখাতে রুপার ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ হিসেবেও রুপার চাহিদা বেড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে রুপার দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায়।
ভোক্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, স্বর্ণ ও রুপার দামের এই অস্থিরতা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিয়ের সময় গহনা কেনা কিংবা উৎসব উপলক্ষে স্বর্ণ বা রুপার অলংকার কেনা এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আবার ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়লেও স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি কমে যাবে না। কারণ বাংলাদেশে স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, বরং নিরাপদ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত।
আগামী দিনে স্বর্ণ ও রুপার দাম কোন দিকে যাবে—তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি স্থিতিশীলতা আসে, তাহলে স্থানীয় বাজারেও কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। আবার কেউ মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে সাধারণ ক্রেতা থেকে বিনিয়োগকারী—সবাই এখন দামের ওঠানামার দিকে সতর্ক নজর রাখছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বর্ণ ও রুপার বাজার এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। দামের এই অস্থিরতার মধ্যে আজ দেশের বাজারে স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি হচ্ছে সর্বশেষ সমন্বয়কৃত উচ্চ দামে। ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই বাজার পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।