বিলিয়ন ডলার ক্লাবে আট শিল্প গ্রুপ, নেতৃত্বে এমজিআই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৮ বার
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে আট শিল্প গ্রুপ, নেতৃত্বে এমজিআই

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পখাতে বড় ধরনের রদবদল ও গতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের আমদানি–রপ্তানির চূড়ান্ত হিসাব বিশ্লেষণে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওঠানামার মধ্যেও বাংলাদেশে এমন আটটি শিল্প গ্রুপ রয়েছে, যারা আমদানি ও রপ্তানি মিলিয়ে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১০০ কোটি ডলারের বেশি লেনদেন করেছে। শিল্পখাতের ভাষায় যাদের বলা হচ্ছে ‘বিলিয়ন ডলার ক্লাব’-এর সদস্য। এবার এই ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি একটি বিদেশি শিল্প গ্রুপও।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে থাকা আট শিল্প গ্রুপ হলো মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, বিএসআরএম গ্রুপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন ইয়াংওয়ান করপোরেশন। আগের অর্থবছরে এই তালিকায় থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে বসুন্ধরা গ্রুপ তালিকা থেকে ছিটকে গেছে, যা শিল্পখাতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকৃত আমদানি ও রপ্তানি তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করেছে প্রথম আলো। হিসাবের ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ের লেনদেন এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার প্রথমবারের মতো দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিদেশি শিল্প গ্রুপকেও এই বিলিয়ন ডলার ক্লাবের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গত অর্থবছরে এই আট শিল্প গ্রুপের মোট আমদানি–রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ২৫৪ কোটি মার্কিন ডলার, যা ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানি–রপ্তানির প্রায় ১১ শতাংশ। শুধু তাই নয়, এসব শিল্প গ্রুপ সরকারের কোষাগারে রাজস্ব হিসেবে জমা দিয়েছে ১৭ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে সোয়া পাঁচ লাখ মানুষের, যা দেশের শ্রমবাজার ও সামাজিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

এবারের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই। দীর্ঘদিন ধরেই উৎপাদনমুখী শিল্পখাতে নেতৃত্ব দিয়ে আসা এই গ্রুপটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানি মিলিয়ে মোট ২৮৩ কোটি ডলারের লেনদেন করেছে। শুধু আমদানিতেই গ্রুপটির ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭৫ কোটি ডলার, যার বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে প্রায় ৫ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের পণ্য। আগের অর্থবছরের তুলনায় তাদের লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, নতুন নতুন কারখানা স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণের কারণে কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। ইস্পাত, কাচ, সমুদ্রগামী জাহাজ ও হেলিকপ্টার বহরে বিনিয়োগের পাশাপাশি গ্রুপটি নিয়মিত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। প্রায় পাঁচ দশক আগে যাত্রা শুরু করা এমজিআই বর্তমানে ‘ফ্রেশ’সহ একাধিক শক্তিশালী ব্র্যান্ডের মাধ্যমে দেশীয় বাজারে আধিপত্য বজায় রেখেছে।

দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, যারা মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দুই ধাপ এগিয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গ্রুপটির মোট লেনদেন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। বহুমুখী পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এই গ্রুপটি তৈরি পোশাক খাতের বাইরেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী বলেছেন, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ার কারণে তাদের লেনদেন বেড়েছে। পাশাপাশি তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান।

ভারী শিল্পখাতে নেতৃত্ব দেওয়া আবুল খায়ের গ্রুপ এবার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। ইস্পাত, সিমেন্ট ও ঢেউটিন উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় এই গ্রুপটি গত অর্থবছরে প্রায় ১৬৮ কোটি ডলারের আমদানি–রপ্তানি লেনদেন করেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ইস্পাত কারখানার উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর ফলে গ্রুপটির শিল্প সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

বিলিয়ন ডলার ক্লাবে একমাত্র বিদেশি শিল্প গ্রুপ হিসেবে রয়েছে ইয়াংওয়ান করপোরেশন। দক্ষিণ কোরীয় উদ্যোক্তা কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিনির্ভর পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। গত অর্থবছরে ইয়াংওয়ান আমদানি করেছে প্রায় ৫৫ কোটি ডলারের কাঁচামাল এবং রপ্তানি করেছে প্রায় ৯৭ কোটি ডলারের পণ্য।

অন্যদিকে সিটি গ্রুপের লেনদেন কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। ভোগ্যপণ্য থেকে বেরিয়ে বহুমুখী বিনিয়োগে যাওয়ার ফলে সাময়িকভাবে তাদের প্রবৃদ্ধি কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্কয়ার গ্রুপ ও টি কে গ্রুপ দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে তালিকায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। ইস্পাত খাতের প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম একক খাতেই বিলিয়ন ডলার লেনদেন করে তালিকায় টিকে রয়েছে, যদিও বাজার মন্দার কারণে তাদের লেনদেন কিছুটা কমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিলিয়ন ডলার ক্লাব বাংলাদেশের শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পের বিকাশই এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি। তবে ভবিষ্যতে এই গতি ধরে রাখতে উন্নত বন্দর ব্যবস্থাপনা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের হিসাব বলছে, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্পখাত এগিয়ে যাচ্ছে। বিলিয়ন ডলার ক্লাবে থাকা এই আট শিল্প গ্রুপ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতীক নয়, বরং কর্মসংস্থান, রাজস্ব আয় ও শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত