প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষে যে সরকারই দায়িত্ব নিক না কেন, শুরুতেই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অন্তত তিনটি বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জ। তীব্র গ্যাস সংকট, আসন্ন রমজান, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মে বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা সামাল দেওয়া এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিপুল অঙ্কের বকেয়া পরিশোধ—এই তিন সংকট একসঙ্গে সামলানো নতুন সরকারের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ইতোমধ্যে এসব সমস্যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্প খাতে।
দেশজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আবাসিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন—সব খাতেই গ্যাসের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন চুলা জ্বলছে না বা খুব অল্প সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। শিল্প কারখানাগুলোও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়েছে, যা সরাসরি অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানিয়েছেন, তিতাসের দৈনিক গ্যাস চাহিদা যেখানে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে বর্তমানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এই ঘাটতির কারণে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এর ফলে শহরাঞ্চলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শিল্প খাতেও মারাত্মক। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিস অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা সিএনজি, এলপিজি কিংবা ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই গ্যাস সংকটের মধ্যেই সামনে আসছে রমজান মাস, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকাল। এই সময় বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে দেশে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, রমজানে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়লে লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে ইফতার ও সেহরির সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বহুগুণে বেড়ে যাবে।
গত ২১ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল আন্তমন্ত্রণালয় সভায় পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয় যে, অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ক্রমাগত কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বিঘ্নিত হতে পারে। এই সতর্কবার্তা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হতে যাচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের পর দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ এতটাই কমে যাবে যে বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়বে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ খাত তীব্র সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছর সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রীষ্মে এই চাহিদা আরও বাড়বে। যদি চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দেড় থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। রমজান মাস এই সময়ের মধ্যে পড়ায় গ্রাহক ভোগান্তি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) আসন্ন রমজান, সেচ মৌসুম, জাতীয় নির্বাচন ও গ্রীষ্মকালীন বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে অতিরিক্ত ৩৮ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। পিডিবি আশঙ্কা করছে, এই ভর্তুকি না পেলে আগামী মাস থেকেই দেশজুড়ে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং শুরু হতে পারে। পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে গরম ও রমজানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকিও রয়েছে।
তৃতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নতুন সরকারের সামনে আসবে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি। পিডিবি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে পারছে না। এতে ব্যাংক ঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা জমতে থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত জানিয়েছেন, অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকের ছয় থেকে সাত মাসের বিল সরকারের কাছে বকেয়া রয়েছে। এই বকেয়া না পেলে তারা এলসি খুলতে পারবেন না, ফলে জ্বালানি তেল আমদানিও সম্ভব হবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নতুন সরকারের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ও সমন্বিত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতি এই সংকট কতটা সামাল দিতে পারবে।