প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল দ্রুত চালুর দাবিতে নতুন করে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটি। দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে থাকা এই শিল্পকারখানাগুলো চালু না হওয়ায় শ্রমিক, কর্মচারী ও আখচাষিদের জীবন-জীবিকা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। দাবি আদায়ে আগামী ৩১ মার্চ শিল্প মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে ২৬ মার্চ পর্যন্ত দেশের সব বন্ধ ও চালু চিনিকলে ধারাবাহিক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় শিল্প ধ্বংসের ধারাবাহিকতায় ছয়টি চিনিকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং আখচাষিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংগঠনটির জোর দাবি, অবিলম্বে মিলগুলো আধুনিকায়ন করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা হোক এবং দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক নুর রহমান পলাশ। সঞ্চালনায় ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কামরুজ্জামান ফিরোজ। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বন্ধ ছয়টি চিনিকল চালু করা কেবল শ্রমিকদের দাবি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি, কৃষি খাত এবং খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশীয় চিনি শিল্প ধ্বংস করে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে, যার সুফল পেয়েছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী।
সংবাদ সম্মেলনে কামরুজ্জামান ফিরোজ বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে জাতীয় গণফ্রন্ট এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাক্ষাতে বন্ধ ছয়টি চিনিকল আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে মিলগুলো চালুর ঘোষণাও আসে। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না দিয়ে আখমাড়াই কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়, যা শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, মিল বন্ধ রাখার মাধ্যমে একটি সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে শুধু শ্রমিকরা নয়, আখচাষিরাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আখ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক কৃষক বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ কেউ চাষাবাদ ছেড়ে দিয়েছেন। এতে কৃষি বহুমুখীকরণ নয়, বরং অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, চিনিকলগুলো বন্ধ থাকার কারণে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে এবং অবকাঠামো দিন দিন ভেঙে পড়ছে। সময়মতো মিলগুলো চালু না করলে ভবিষ্যতে পুনরায় চালু করতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় হবে। তাই এখনই রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখিয়ে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা এস এম ফয়েজ হোসেন, জাতীয় গণতান্ত্রিক শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি তৈমুর খান অপু, চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের সিবিএ নেতা মো. হুমায়ুন কবির পাটোয়ারীসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। তারা বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো একসময় দেশের শিল্পখাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার দায় শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে মিল বন্ধ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বক্তব্য রাখেন জাতীয় কৃষক খেতমজুর সমিতির সভাপতি ও জাতীয় গণফ্রন্টের সমন্বয়ক জননেতা টিপু বিশ্বাস। তিনি বলেন, চিনিকল বন্ধ মানে শুধু শিল্প বন্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো কৃষকের জীবিকা। আখচাষিদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত না করলে কৃষি খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি অভিযোগ করেন, আমদানিনির্ভর নীতির কারণে দেশীয় উৎপাদন ধ্বংস করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন টাফের সভাপতি ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ফয়জুল হাকিম বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ধ্বংসের বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলন আরও জোরদার হবে। অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক কর্মচারী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস ইমাম বলেন, মিল বন্ধ করে শ্রমিকদের অবসর সুবিধা ও পাওনা পরিশোধ না করায় বহু পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন কেরু অ্যান্ড কোং-এর সাবেক সিবিএ সভাপতি মো. হাফিজুল ইসলাম, জিডি কল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটির হাফিজুল ইসলাম, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শামীম ইমাম এবং রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কাইয়ুম হোসেন। তারা সবাই একযোগে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় আন্দোলন আরও বিস্তৃত করা হবে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২৬ মার্চ পর্যন্ত দেশের সব চিনিকলে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। এরপরও দাবি মানা না হলে ৩১ মার্চ শিল্প মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণাও আসতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন নেতারা।
সব মিলিয়ে, বন্ধ ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল চালুর দাবিতে ঘোষিত এই আন্দোলন নতুন করে শ্রমিক ও কৃষক রাজনীতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প রক্ষা, কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ এবং দেশীয় উৎপাদন পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে শ্রমিক-কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট মহল।