জানুয়ারিতে অর্থনীতির গতি কমল, মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তার চাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৯ বার
জানুয়ারিতে অর্থনীতির গতি কমল, মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তার চাপ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বছরের শুরুতেই দেশের অর্থনীতিতে ধীরগতির ইঙ্গিত মিলেছে। জানুয়ারি মাসে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি কমেছে বলে জানিয়েছে সাম্প্রতিক পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) সূচক। গতকাল প্রকাশিত এই সূচক অনুযায়ী, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে সামগ্রিক পিএমআই শূন্য দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৫৩ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে, যেখানে আগের মাসে সূচকের মান ছিল ৫৪ দশমিক ২। যদিও সূচক এখনও ৫০-এর ওপরে থাকায় সম্প্রসারণের ধারাই বোঝায়, তবু গতি কমে যাওয়ার বার্তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে উচ্চ ব্যয়, নগদ অর্থের সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশে সতর্কতা বেড়েছে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রতি মাসে এই পিএমআই সূচক প্রকাশ করছে। কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—এই চারটি প্রধান খাতের ওপর ভিত্তি করে সূচকটি তৈরি হয়। জানুয়ারির ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, নির্মাণ ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির গতি শ্লথ। বিশেষ করে উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতে চাহিদা ও অর্ডারের গতি প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়, যা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পিএমআই পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, কাঁচামাল, শ্রম, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ায় ব্যবসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অথচ বিক্রি ও নতুন অর্ডার সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে অনেক উদ্যোক্তা মুনাফার চাপ অনুভব করছেন। নগদ অর্থের সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কড়াকড়ি মুদ্রানীতির প্রভাব, উচ্চ সুদের হার এবং ঋণপ্রাপ্তির শর্ত কঠোর হওয়ায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে অনীহা বাড়ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বড় অর্ডার দেওয়া বা নতুন বিনিয়োগে এগোনো ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফল হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার স্থগিত, সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বিলম্বিত এবং ক্রেতাদের মধ্যে সতর্ক আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মৌসুমি প্রভাব ও আমদানির চাপের কারণে কিছু খাতে চাহিদা আরও কমেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে।

তবে হতাশার মধ্যেও আশার ইঙ্গিত রয়েছে। ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, মার্চ মাসের পর কিংবা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সর্বশেষ পিএমআই সূচকগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে অর্থনীতিতে সম্প্রসারণের গতি কিছুটা কমেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বল পুনরুদ্ধার এবং অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা উৎপাদন খাতের রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতির সব প্রধান খাতে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ সামনে টেকসই আশাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক এই প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেও ঊর্ধ্বমুখী ছিল মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। আগের মাস ডিসেম্বরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ধারাবাহিক এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ভোক্তা চাহিদায় চাপ সৃষ্টি করছে।

তবে বছরের তুলনামূলক চিত্রে কিছুটা স্বস্তির জায়গাও আছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা বর্তমান হারের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বার্ষিক তুলনায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মাসভিত্তিক হিসাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটকে আরও সংকুচিত করছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই আজ নতুন বছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিকাল সাড়ে ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর আনুষ্ঠানিকভাবে মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ছয় মাস অন্তর মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে থাকে, যার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অর্থের জোগান, সুদের হার কাঠামো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে সহায়তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান নীতিকৌশলের ধারাবাহিকতায় এবারের মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতিগত সুদের হার কমানো থেকে বিরত থাকতে। সেই প্রেক্ষাপটে আগামী ছয় মাসেও বর্তমান কড়াকড়ি বা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে। সর্বশেষ ঘোষিত নীতিতে নীতিগত সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এই কাঠামোর লক্ষ্য ছিল বাজারে অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো।

মূলত টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দর বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকেই দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি হঠাৎ বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে, যেখানে আগের মাস আগস্টে ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সেই সময় থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর নীতি গ্রহণ করে আসছে। যদিও এই নীতির ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে, তবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শ্লথতা তৈরি হয়েছে বলে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ মনে করছেন।

সব মিলিয়ে জানুয়ারির অর্থনৈতিক চিত্রে মিশ্র বার্তা মিলছে। একদিকে পিএমআই সূচক ইঙ্গিত দিচ্ছে সম্প্রসারণের গতি কমার, অন্যদিকে নির্মাণ ও সেবা খাতে ধারাবাহিক কার্যক্রম কিছুটা স্বস্তি জোগাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও কড়াকড়ি মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদে চাপ তৈরি করলেও, নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি আবার গতি পেতে পারে—এমন প্রত্যাশাই করছেন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীরা। এখন দেখার বিষয়, নতুন মুদ্রানীতি এই চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশার ভারসাম্য কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত