নির্বাচনে আকাশে নজর, মাঠে নামছে ১০০০ ড্রোন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৫ বার
নির্বাচনে ড্রোন নজরদারি

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ও নজরদারিতে একেবারে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধ, অনিয়ম ঠেকানো এবং দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে আকাশ থেকে ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উড়ানো হবে এক হাজার ড্রোন। নির্বাচন কমিশনের এই নজিরবিহীন উদ্যোগকে দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে একটি বড় ধরনের প্রযুক্তিগত মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা দেশের ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকাগুলোতে একযোগে এই ড্রোন নজরদারি কার্যক্রম চালানো হবে। বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী টেকনাফ থেকে ফেনী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব অঞ্চল অতীতে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ও নাশকতার আশঙ্কার কারণে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কারিগরি সহায়তায় এই ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, এই ড্রোনগুলো কার্যত উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের মতো ভূমিকা পালন করবে। আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ ও তথ্য সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে স্থাপিত কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেলে পৌঁছে যাবে রিয়েল-টাইমে। ফলে মাঠপর্যায়ের যে কোনো পরিস্থিতি মুহূর্তেই ইসির নজরে আসবে।

ইসির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেই থেমে থাকছে না কমিশন। মাঠে সক্রিয় থাকবে ডিজিএফআই, এনএসআই, র‌্যাব, বিজিবিসহ মোট ২১টি আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থা। ড্রোনের মাধ্যমে যদি কোনো নাশকতার প্রস্তুতি, অস্ত্র প্রদর্শন, সহিংস সমাবেশ বা সন্দেহজনক গোপন তৎপরতা শনাক্ত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট বাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য একটি বিশেষায়িত ‘ই-মনিটরিং’ অ্যাপ ব্যবহার করা হবে, যার মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পাহাড়ি এলাকা ও চরাঞ্চলের মতো দুর্গম অঞ্চলে সাধারণত দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়। এসব এলাকায় প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থক এবং ভোটারদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে ড্রোন বড় ভূমিকা রাখবে। একইভাবে কোথাও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বা নাশকতার চেষ্টা হলে আকাশ থেকেই তা শনাক্ত করে সরাসরি অভিযান চালাতে পারবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

কক্সবাজার ও টেকনাফ অঞ্চলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকালে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে কোনো বহিরাগত প্রভাব বিস্তার বা অবৈধ তৎপরতা চিহ্নিত হলে সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ স্কোয়াড সক্রিয় হবে। ড্রোন থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ ও তথ্য ইসির আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে কোনো ধরনের বিলম্ব ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, কমিশনের লক্ষ্য হলো নির্বাচনকে পুরোপুরি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ রাখা। তিনি বলেন, পাহাড়, সীমান্ত কিংবা দুর্গম কোনো এলাকা—কোথাও যদি অপ্রীতিকর কিছু ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়, আমাদের ড্রোন তা সেকেন্ডের মধ্যে ইসির নজরে আনবে। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার ভাষায়, প্রযুক্তির এই ব্যবহার নির্বাচনি নিরাপত্তায় নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এক হাজার ড্রোনের মাধ্যমে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারা বলছেন, অতীতে নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, কেন্দ্র দখল বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ছিল একটি বড় সমস্যা। আকাশ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকলে এসব অপতৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি তৈরি হবে, যা ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

মানবাধিকার ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, প্রযুক্তির এই ব্যবহার ইতিবাচক হলেও এর প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বলছেন, ড্রোন নজরদারি যেন কোনোভাবেই ভোটারদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই প্রযুক্তি কেবল নিরাপত্তা ও সহিংসতা প্রতিরোধের জন্যই ব্যবহার করা হবে, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়।

এদিকে মাঠপর্যায়ের অনেক ভোটার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, নির্বাচনের দিন নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কা থাকে, ড্রোন নজরদারি তা অনেকটাই কমাবে। বিশেষ করে গ্রাম ও দুর্গম এলাকার ভোটাররা মনে করছেন, আকাশে নজর থাকলে তারা আরও নিশ্চিন্তে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন।

সব মিলিয়ে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এক হাজার ড্রোনের চোখে আকাশ থেকে মাঠ পর্যবেক্ষণের এই অভিজ্ঞতা সফল হলে ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এটি একটি স্থায়ী মডেল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত