প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল জেট ফুয়েলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম সামান্য বৃদ্ধি করা হলেও আন্তর্জাতিক রুটের ক্ষেত্রে আগের দামই বহাল রাখা হয়েছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বিইআরসি এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, যা রোববার দিবাগত রাত ১২টা থেকেই কার্যকর হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১৯ পয়সা বাড়িয়ে ৯৫ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এই দাম ছিল ৯৪ টাকা ৯৩ পয়সা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রুটে জেট ফুয়েলের দাম অপরিবর্তিত রেখে লিটারপ্রতি ৬২ সেন্টই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে দেশের ভেতরের বিমান চলাচলে জ্বালানি ব্যয়ে সামান্য বৃদ্ধি হলেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর নতুন করে কোনো বাড়তি চাপ আসছে না।
বিইআরসি জানিয়েছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩৪ (৪) ও ৩৪ (৬) অনুযায়ী এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (পিওসিএল) প্রস্তাবের ভিত্তিতে গণশুনানি গ্রহণসহ বিস্তারিত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের পর কমিশন এ সিদ্ধান্ত নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যয়—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল দেশের বিমান খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। একটি ফ্লাইট পরিচালনায় মোট ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানি তেলের পেছনে খরচ হয়। ফলে জেট ফুয়েলের দামের সামান্য পরিবর্তনও এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকিটের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এবারের বাড়তি মূল্য তুলনামূলকভাবে খুব বেশি নয়, তবুও অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে যুক্ত বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
দেশীয় এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী ভাড়া তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয় এবং সেখানে প্রতিযোগিতাও বেশি। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি টিকিটের দামে প্রতিফলিত করা সবসময় সম্ভব হয় না। অনেক সময় এয়ারলাইন্সগুলোকে নিজেদের মুনাফা কমিয়ে পরিচালনা চালিয়ে যেতে হয়। তবে বিইআরসির নির্ধারিত এই সামান্য বৃদ্ধি আপাতত বড় কোনো চাপ সৃষ্টি করবে না বলেই তারা মনে করছেন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রুটে জেট ফুয়েলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিমান খাতের বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে ডলারভিত্তিক ব্যয় বেশি হওয়ায় সেখানে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর বড় চাপ তৈরি হয়। সেই চাপ শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপর গিয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক রুটে দাম অপরিবর্তিত রাখায় এয়ারলাইন্সগুলো অন্তত এই খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ খরচ এবং সরকারি রাজস্ব কাঠামো—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়। পাশাপাশি কমিশন নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও গণশুনানির মাধ্যমে মতামত গ্রহণ করে থাকে। এবারের ক্ষেত্রেও বিপিসি ও পিওসিএলের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে গণশুনানি গ্রহণ করা হয় এবং পরে কমিশনের সদস্যরা বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ একটি সংবেদনশীল বিষয়, কারণ এটি শুধু বিমান খাতেই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং জরুরি সেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় দ্রুত যোগাযোগের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের বিকল্প নেই। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সেই প্রভাব দেশের বিভিন্ন স্তরে অনুভূত হতে পারে।
গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট এবং উৎপাদনকারী দেশগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়ে তেলের বাজার অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিবর্তন সরাসরি দেশের জ্বালানি মূল্য কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলে। বিইআরসি নিয়মিতভাবে এই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী দাম সমন্বয় করে থাকে।
বিমান খাতের পাশাপাশি জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্তে সরকারের রাজস্ব আয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। অতীতে জ্বালানি তেলের দামের কারণে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি খাতে ধীরে ধীরে সমন্বয়মূলক নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে একদিকে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ রুটে জেট ফুয়েলের দাম বাড়লেও আন্তর্জাতিক রুটে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ব্যয় সমন্বয় হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় থাকবে। পাশাপাশি পর্যটন ও প্রবাসী যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কমবে।
সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য জেট ফুয়েলের নতুন মূল্য নির্ধারণ বিমান খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও অভ্যন্তরীণ রুটে সামান্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক রুটে দাম অপরিবর্তিত থাকায় সামগ্রিকভাবে বড় কোনো অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও ডলারের বিনিময় হারের ওপর ভিত্তি করে জেট ফুয়েলের দাম আবারও সমন্বয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন