আংশিক মেঘলা আকাশে শুষ্ক আবহাওয়া, বাড়তে পারে তাপমাত্রা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
পাকিস্তানে ফিরে এলো ঘুড়ি উৎসব

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক রাজধানী লাহোরে আবারও ফিরে এসেছে ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব ‘বসন্ত’। ১৯ বছর পর অনুষ্ঠিত এই উৎসব ঘিরে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে নগরীর আকাশ, মানুষ আর স্মৃতিগুলো। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে ঘুড়ি ওড়ানোকে কেন্দ্র করে গান, নাচ, খাবার আর মানুষের মিলনমেলায় লাহোর পরিণত হয় এক রঙিন আনন্দনগরীতে। পুরোনো শহরের সরু গলি থেকে শুরু করে অভিজাত আবাসিক এলাকা—সবখানেই ছিল উৎসবের ছোঁয়া।

লাহোরের আকাশ এ কদিন ছিল নিওন রঙের ঘুড়িতে ভরা। চারপাশে ভেসে বেড়িয়েছে ড্রামের শব্দ, মানুষের উল্লাস আর শিশুদের কোলাহল। একসময় যে বসন্ত উৎসব লাহোরের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, দীর্ঘ নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ও দুর্ঘটনার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। সেই শূন্যতা এত বছর পর পূরণ হলো, আর তাতেই শহরজুড়ে ফিরে এসেছে হারানো আবেগ।

এবারের বসন্ত উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল প্রজন্মের মেলবন্ধন। যারা একসময় ঘুড়ির নাটাই হাতে আকাশ জয়ের লড়াই করতেন, সেই প্রবীণরা বহু বছর পর আবারও নিজেদের পুরোনো দক্ষতা ঝালিয়ে নিলেন। অন্যদিকে, জেন-জি বা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জীবনে প্রথমবার ঘুড়ি ওড়ানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করল। তাদের কাছে এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার এক অনন্য সুযোগ।

২৫ বছর বয়সি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আবু বকর আহমেদ বলেন, তিনি এতদিন শুধু গল্পেই বসন্ত উৎসবের কথা শুনেছেন। এবার নিজের চোখে আকাশভরা ঘুড়ি দেখে তিনি অভিভূত। তার মতো অসংখ্য তরুণ-তরুণী এই উৎসবের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছেন, কেন বসন্ত লাহোরবাসীর হৃদয়ে এত গভীরভাবে জায়গা করে আছে।

শুধু স্থানীয়রাই নয়, প্রবাসী পাকিস্তানিরাও বসন্তের টানে ফিরেছেন দেশে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মিনা সিকান্দার বলেন, ছোটবেলায় দেখা বসন্ত উৎসবের স্মৃতি আজও তাকে নাড়া দেয়। সেই স্মৃতির টানেই তিনি হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে লাহোরে এসেছেন। তার কাছে বসন্ত মানে শুধু ঘুড়ি নয়, পরিবার, শৈশব আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের সঙ্গে পুনর্মিলন।

স্থানীয়দের মতে, বসন্ত উৎসব কেবল ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়; এটি সামাজিক বন্ধন, সহমর্মিতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক মিলনমেলা। ছাদে ছাদে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠে, অপরিচিতরাও হয়ে ওঠে পরিচিত। উৎসবের আবহে শ্রেণি বা পেশার ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়।

তবে এই উৎসবের পুনরাগমন সহজ ছিল না। অতীতে ঘুড়ির সুতা নিয়ে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে বসন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার পাকিস্তান সরকার ও লাহোর পুলিশ নেয় কঠোর ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। উৎসবের সময়সীমা তিন দিনে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং বড় আকৃতির ঘুড়ি ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়, যাতে আকাশে বিশৃঙ্খলা বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে।

বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় মোটরসাইকেল চালকদের নিরাপত্তার ওপর। অতীতে ঝুলে থাকা ধারালো সুতায় গলা কেটে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বাইকের হ্যান্ডেলে মেটাল রড বসানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে সামনে থাকা সুতা সহজেই সরিয়ে দেওয়া যায়। একই সঙ্গে রাস্তায় পুলিশি টহল বাড়ানো হয়।

নিষিদ্ধ ও বিপজ্জনক সুতা ঠেকাতে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই শুরু হয় ব্যাপক অভিযান। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে প্রায় এক লাখ ঘুড়ি ও দুই হাজারের বেশি সুতার রোল জব্দ করা হয়েছে। বাজারগুলোতে নিয়মিত নজরদারি চালানো হয়, যাতে কেউ গোপনে ঝুঁকিপূর্ণ সুতা বিক্রি করতে না পারে। এই পদক্ষেপ উৎসবকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লাহোর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের লক্ষ্য ছিল উৎসবের আনন্দ ফিরিয়ে আনা, কিন্তু কোনোভাবেই মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলা। তাই প্রযুক্তি, জনবল ও সচেতনতামূলক প্রচারণার সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তার মতে, এবারের বসন্ত উৎসব ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সংস্কৃতিবিদরা বলছেন, বসন্ত উৎসবের প্রত্যাবর্তন পাকিস্তানের সামাজিক জীবনে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা সংকটের খবরের মধ্যেই মানুষ যখন ক্লান্ত, তখন এমন উৎসব মানুষের মনে আশার আলো জ্বালায়। এটি প্রমাণ করে, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মানুষকে আবার একত্র করতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই উৎসব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ঘুড়ি, সুতা, খাবার ও সজ্জাসামগ্রীর ব্যবসায়ীদের জন্য এটি ছিল বড় সুযোগ। হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় বেড়েছে, স্থানীয় পর্যটনেও এসেছে গতি। লাহোরের অর্থনীতিতে এই উৎসব সাময়িক হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে, ১৯ বছর পর বসন্ত উৎসবের ফিরে আসা লাহোরের জন্য শুধু একটি সাংস্কৃতিক ঘটনাই নয়, বরং আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের এক প্রতীক। আকাশভরা রঙিন ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসেছে মানুষের হাসি, স্মৃতি আর ভবিষ্যতের প্রতি নতুন আশা। নিরাপত্তা ও ঐতিহ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এই উৎসব যদি নিয়মিত আয়োজন করা যায়, তবে তা পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন অধ্যায় যোগ করবে বলেই প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত