নতুন সরকারে আস্থা, তবে অর্থনীতিতে কঠিন চ্যালেঞ্জ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
নতুন সরকারে আস্থা, তবে অর্থনীতিতে কঠিন চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পর নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে, আর সেই পরিবর্তনের দিকে আশাবাদী চোখে তাকিয়ে আছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে তাঁরা মনে করছেন, একটি স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। তবে আশার পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও তাঁরা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছেন।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে এই বিজয়কে ব্যবসায়ী মহল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। তাঁদের বিশ্বাস, শক্তিশালী রাজনৈতিক ম্যান্ডেট থাকলে সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত বস্ত্রখাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন–এর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নতুন সরকারের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, বস্ত্রখাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রাখে, অথচ এই খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা নীতিগত জটিলতা, জ্বালানি সংকট এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তিনি আশা করছেন, নতুন সরকার এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব কমানো এখন সময়ের দাবি। তাঁর অভিযোগ, গত প্রায় দেড় বছরে বস্ত্রখাতের শীর্ষ নেতারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করার সুযোগ পাননি। ফলে বাস্তব সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারণে বেসরকারি খাতকে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি–এর সংস্কারের বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এই সংগঠনকে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে পারলে ব্যবসায়ীদের বাস্তব সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

অন্যদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি–এর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ আয়োজনকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বিপুল ভোটার উপস্থিতি প্রমাণ করে জনগণের আস্থা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি এখনও দৃঢ় রয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম প্রধান শর্ত, আর এই নির্বাচনের ফলাফল সেই স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা। বর্তমানে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং জ্বালানি সংকট ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসবে না।

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন–এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাঁর মতে, বিদেশি ক্রেতারা সবসময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন। যদি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক বা সহিংসতা দেখা দিত, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারতেন।

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে দেশের ভেতরে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে শিল্প খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ–এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, কয়েক মাসের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর ব্যবসায়ী সমাজ এখন কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছে। তিনি মনে করেন, এই নির্বাচন দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করতে সহায়ক হবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা সমস্যাগুলো সমাধান করা সহজ হবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–সমর্থিত নীতিমালাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

একই সঙ্গে তিনি আসন্ন এলডিসি উত্তরণের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রবেশ করবে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

একজন শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, বিনিয়োগকারীরা সবসময় একটি বিষয় নিশ্চিত হতে চান—নীতির ধারাবাহিকতা। যদি তারা বিশ্বাস করেন যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে, তাহলে বিনিয়োগের প্রবাহ আবার বাড়বে।

নতুন সরকারকে একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একদিকে জনগণ মূল্যস্ফীতি কমানো এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির আশা করছে, অন্যদিকে সরকারকে রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ সামলাতে হবে।

সব মিলিয়ে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ নতুন সরকারের প্রতি আশাবাদী হলেও তারা বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। তারা মনে করছেন, সঠিক নীতি, কার্যকর সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবার অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরে পেতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ পথচলা। ব্যবসায়ী সমাজ সেই পথচলার অংশ হতে প্রস্তুত, এখন তারা অপেক্ষা করছে নতুন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের জন্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত