নির্ধারিত দামে সিটি গোল্ড, না মানলে জরিমানা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৭ বার
নির্ধারিত দামে সিটি গোল্ড, না মানলে জরিমানা

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যশোর ও ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী জনপদে বহু বছর ধরে নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী শিল্প। নাম ‘সিটি গোল্ড’। সোনার বিকল্প হিসেবে তৈরি এই অলংকার দেশের লাখো মানুষের নাগালের মধ্যে সৌন্দর্য এনে দিয়েছে। কিন্তু কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারের অস্থিরতার কারণে এই শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে যশোর ও ঝিনাইদহের সিটি গোল্ড মালিক সমিতি প্রথমবারের মতো নির্ধারিত মূল্য বেঁধে দিয়েছে। সেই মূল্য না মানলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধানও করা হয়েছে। ফলে এই শিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যা নিয়ে উদ্যোক্তা, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলছে আলোচনা।

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা ও যশোর শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে সিটি গোল্ড তৈরির বিশাল নেটওয়ার্ক। মহেশপুর উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রামে ১০ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গ্রামীণ ঘরের উঠোন, ছোট ঘর কিংবা বারান্দা—সবখানেই এখন দেখা যায় অলংকার তৈরির ব্যস্ততা। কেউ তৈরি করছেন কানের দুল, কেউ গলার চেইন, কেউবা চুড়ি বা আংটি। এসব অলংকার পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে।

সিটি গোল্ড মূলত তামা বা পিতলের ওপর সোনার পাতলা প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয়। দেখতে প্রায় আসল সোনার মতো হলেও দাম অনেক কম হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিয়ের অনুষ্ঠান, উৎসব বা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এটি এখন অন্যতম পছন্দের অলংকার।

তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা। গত কয়েক মাসে তামা, পিতল ও রুপাসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম কয়েক দফায় বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় প্রস্তুত গয়নার দাম বাড়েনি। ফলে উদ্যোক্তারা লাভের পরিবর্তে লোকসানের মুখে পড়েন। কারিগরদের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে সিটি গোল্ড মালিক সমিতি সম্প্রতি ১২ দিন কারখানা বন্ধ রেখে আন্দোলন করে। তাদের দাবি ছিল, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম বাড়াতে হবে। পরে আলোচনার মাধ্যমে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এখন থেকে প্রতি জোড়া কানের দুলের পাইকারি মূল্য সর্বনিম্ন ১১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৯ টাকা।

সমিতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম রিপন বলেন, এত দিন নির্দিষ্ট মূল্য না থাকায় অনেকেই কম দামে বিক্রি করতেন। এতে পুরো শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তাই সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য হয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, কেউ নির্ধারিত দামের নিচে বিক্রি করলে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। এমনকি কেউ যদি এই ধরনের অনিয়মের তথ্য দেন, তাকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।

সরেজমিনে মহেশপুরের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এই শিল্প শুধু ব্যবসা নয়, অনেক পরিবারের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। নওদা গ্রামের এক নারী কারিগর বলেন, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কাজ করে তিনি সংসারের খরচ চালাতে সাহায্য করেন। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়ায় আগের মতো আয় হচ্ছে না। নতুন মূল্য নির্ধারণে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে তিনি আশা করেন।

এই শিল্পের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়ে গেলে ভারত থেকে বিকল্প হিসেবে সিটি গোল্ডের অলংকার বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। পরে ১৯৯৫ সালে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কারিগর আবদুল হামিদ ও তাঁর ভাই আবদুর রহিম দেশে এই ধরনের গয়না তৈরি শুরু করেন। তাদের হাত ধরেই ধীরে ধীরে এই শিল্প ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০টি কালার বা ইলেকট্রোপ্লেটিং কারখানা। মহেশপুরে রয়েছে ৪০টি এবং যশোর শহরে রয়েছে ১০টি কারখানা। এসব কারখানায় অলংকারে সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়, যা অলংকারকে আসল সোনার মতো উজ্জ্বল করে তোলে।

যশোরের এক কারখানা মালিক শাহদাত হোসেন জানান, একসময় এই শিল্প খুব লাভজনক ছিল। কিন্তু এখন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। নতুন মূল্য নির্ধারণের ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, এই শিল্পের সম্ভাবনা অনেক বড়। কারণ সোনার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে বিকল্প হিসেবে সিটি গোল্ডের চাহিদা বাড়ছে। তবে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে একটি শক্তিশালী বিকল্প গড়ে তুলছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং কারিগরদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।

নতুন মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তে আপাতত স্বস্তি ফিরলেও সামনে আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কাঁচামালের দাম যদি আবার বাড়ে, তাহলে এই শিল্প আবার সংকটে পড়তে পারে। তবুও আশা ছাড়ছেন না উদ্যোক্তা ও কারিগরেরা। কারণ তাদের বিশ্বাস, সিটি গোল্ড শুধু একটি শিল্প নয়, এটি তাদের জীবনের অংশ, তাদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক।

এই শিল্পের প্রতিটি অলংকারে শুধু ধাতু নয়, মিশে থাকে হাজারো মানুষের পরিশ্রম, আশা এবং টিকে থাকার গল্প। আর সেই গল্পই আজ যশোর ও ঝিনাইদহের সীমানা পেরিয়ে পুরো দেশের অর্থনীতির এক নীরব শক্তি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত