যুক্তরাজ্যের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের শিথিলতা: বেসেল-III নিয়ম বাস্তবায়ন পেছালো ২০২৮ সাল পর্যন্ত

একটি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫
  • ১০৭ বার
যুক্তরাজ্যের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের শিথিলতা: বেসেল-III নিয়ম বাস্তবায়ন পেছালো ২০২৮ সাল পর্যন্ত

প্রকাশিত: ১৫ই জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ডেস্ক

বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্য। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেসেল-III চুক্তির কঠোর মূলধন নিয়ম বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্বান্তে ব্রিটিশ ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন অথরিটি (পিআরএ) এর প্রকাশিত বিস্তারিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মূলত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখন এই নিয়মগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ব্যাংকগুলোর ট্রেডিং কার্যক্রমের ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি, আন্তঃব্যাংক লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ এবং মূলধন পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত কঠোর শর্তাবলী বাস্তবায়নে এই সময় বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি এই সিদ্ধান্তকে “সময়োপযোগী ও ভারসাম্যপূর্ণ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, “যুক্তরাজ্যের ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একইসাথে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।”

এই সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই তাদের বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের আলোচনা চলমান রয়েছে। তৃতীয়ত, দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলো আরও সময়ের জন্য ব্যাপকভাবে লবিং করছিল। চতুর্থত, করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাতকে কিছুটা স্বস্তি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত বয়ে এনেছে। সিটি অফ লন্ডন কর্পোরেশনের প্রকাশিত এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “এই অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবসায়িক কৌশল পুনর্বিন্যাস, ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আধুনিকায়ন করতে পারবে।”

তবে কিছু অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সতর্কতা জারি করেছেন। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের প্রফেসর ড. মার্কাস টেলর তার এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছেন, “২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে গৃহীত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে দুর্বল করার সমতুল্য হতে পারে এই সিদ্ধান্ত। দীর্ঘমেয়াদে এটি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”

বাজারে এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ইতিবাচক দেখা গেছে। ঘোষণার পরপরই যুক্তরাজ্যের প্রধান ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর ১.৫% থেকে ২.৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এইচএসবিসি, বার্কলেজ, লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শেয়ারে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস সূচকেও লক্ষণীয় উত্থান পরিলক্ষিত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, “এটি আমাদের আর্থিক খাতের জন্য একটি যুক্তিসঙ্গত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে এটি শুধু ব্যাংকিং খাতই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে এসএমই খাতে ঋণ প্রবাহ অব্যাহত রাখতে এটি সহায়ক হবে।”

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, “যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তের ফলে সেখানকার ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখনই সতর্ক থাকতে হবে যাতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড থেকে আমরা পিছিয়ে না পড়ি।”

এদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই সিদ্ধান্তকে “অঞ্চলভিত্তিক প্রয়োজনীয়তা” হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়েছে যে, বৈশ্বিক ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত