পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরছে, মূলধন বাড়ল ১০৬০ কোটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৩ বার
পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরছে, মূলধন বাড়ল ১০৬০ কোটি

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। টানা উত্থান-পতনের মধ্যেও সর্বশেষ সপ্তাহে বাজার মূলধন বৃদ্ধির পাশাপাশি সূচকের ইতিবাচক ধারা এবং লেনদেনের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সর্বশেষ সাপ্তাহিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-এ (ডিএসই) এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন বেড়েছে ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসেবে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার মূলধনের এই বৃদ্ধি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের প্রতিফলন। বাজার মূলধন মূলত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট শেয়ারের সম্মিলিত মূল্য নির্দেশ করে। যখন এই সূচক বাড়ে, তখন তা বোঝায় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য গড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা বাজারে সক্রিয় হয়েছেন।

সর্বশেষ সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১০ হাজার ৩৭ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৭ লাখ ৮ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এই ব্যবধানের বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বড় বিনিয়োগকারীদের ধীরে ধীরে বাজারে ফিরে আসা এই প্রবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু বাজার মূলধন নয়, সূচকের দিক থেকেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ৬৫ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট, যা শতাংশের হিসেবে ১ দশমিক ২২ শতাংশ বৃদ্ধি। এই সূচক বাজারের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নির্দেশ করে। একই সময়ে ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তবে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক সামান্য কমে ১ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই সামান্য পতন সত্ত্বেও সামগ্রিক বাজারের প্রবণতা ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধিই এই সপ্তাহের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুরো সপ্তাহে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ২৫০ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল মাত্র ১ হাজার ৯১৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৩ হাজার ৩৩৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এই বিপুল বৃদ্ধি বাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণের স্পষ্ট প্রমাণ।

প্রতিদিনের গড় লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫০ কোটি ৪ লাখ টাকা, যেখানে আগের সপ্তাহে এই গড় ছিল ৬৩৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে ৪১১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বা ৬৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়ার ইঙ্গিত দেয় এবং এটি ভবিষ্যতে বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট ৩৮৯টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২০৩টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা বাজারের ইতিবাচক মনোভাবকে প্রতিফলিত করে। একই সময়ে ১৫৩টি কোম্পানির দাম কমেছে এবং ৩৩টি কোম্পানির শেয়ারদর অপরিবর্তিত ছিল। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারমূল্য বৃদ্ধির দিকে ছিল।

দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ-এও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ২ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং সিএসসিএক্স সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। সপ্তাহ শেষে এই সূচকগুলো যথাক্রমে ১৫ হাজার ৩৪৯ দশমিক ০৯ পয়েন্ট এবং ৯ হাজার ৪২৯ দশমিক ৫৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এছাড়া সিএসই-৫০ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং সিএসই-৩০ সূচক বেড়েছে ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সিএসআই সূচকও বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও লেনদেনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেন হয়েছে ৯৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল মাত্র ২৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এটি প্রমাণ করে যে, বিনিয়োগকারীরা দেশের উভয় পুঁজিবাজারেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে ৩২২টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২৩৫টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা একটি শক্তিশালী ইতিবাচক প্রবণতার প্রতিফলন। একই সময়ে ৭০টি কোম্পানির দাম কমেছে এবং ১৭টি কোম্পানির শেয়ারদর অপরিবর্তিত রয়েছে।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ, ব্যাংক আমানতের সুদের হার তুলনামূলক কম থাকা এবং কিছু কোম্পানির ভালো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ। এছাড়া বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বৃদ্ধি এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে নেওয়া পদক্ষেপগুলোও ভূমিকা রাখতে পারে।

অনেক বিনিয়োগকারী দীর্ঘদিন ধরে লোকসান ও হতাশার মধ্যে ছিলেন। বাজারের এই সাম্প্রতিক উত্থান তাদের মধ্যে নতুন করে আশা জাগিয়েছে। একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বলেন, “অনেকদিন পর বাজারে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আবারও সক্রিয় হবেন।”

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বাজারে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গুজব ও কারসাজি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা মনে করেন, বাজারের এই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, বরং দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোম্পানিগুলোর মূলধন সংগ্রহের একটি বড় উৎস। বাজার শক্তিশালী হলে নতুন শিল্প বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।

সর্বশেষ সপ্তাহের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে রয়েছে। এখন বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে এবং বাজার আবারও তার শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত