দাম কমলেও এলপিজি বাজারে স্বস্তি নেই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৩৪ বার
দাম কমলেও এলপিজি বাজারে স্বস্তি নেই

প্রকাশ: ৫ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে জ্বালানি খাতে ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে সরকার সম্প্রতি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা LPG আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য ছিল বাজারে গ্যাসের দাম কমানো এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ কমানো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও এলপিজির বাজারে এখনো শৃঙ্খলা ফিরেনি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকশ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

বর্তমানে Bangladesh Energy Regulatory Commission বা বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। সংস্থাটির নির্ধারণ অনুযায়ী ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের মূল্য ১৩৪১ টাকা। কিন্তু বাস্তব বাজারে এই দাম প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকায়। ফলে সরকারি দাম এবং বাজারদামের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশাল ব্যবধান।

রাজধানীর উত্তরার একটি ছোট হোটেলের কর্মীরা জানান, তাদের রান্নার কাজে প্রতিদিনই একাধিক গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়। মাসে প্রায় ৪৫ কেজি গ্যাসের সমপরিমাণ ব্যবহারের জন্য তাদের ২০টির বেশি সিলিন্ডার কিনতে হয়। প্রতিটি সিলিন্ডারে প্রায় দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় মাস শেষে গ্যাসের পেছনে তাদের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার টাকারও বেশি। এতে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

শুধু ব্যবসায়ী নয়, সাধারণ পরিবারগুলোর জন্যও এলপিজির বাড়তি দাম বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর এক গৃহিণী জেসমিন জানান, সম্প্রতি তিনি একটি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে ১৮৫০ টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। সরকারি দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিক্রেতারা নানা অজুহাত দেখান। তার ভাষায়, “এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জন্য সংসার চালানো খুবই কঠিন হয়ে যাবে। নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই বেশি, তার ওপর গ্যাসের এমন দাম আমাদের জন্য বড় সমস্যা।”

আরেক ভোক্তা জয়নাল বলেন, প্রতিটি সিলিন্ডারে অন্তত ৬০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “গ্যাস তো কিনতেই হবে। চুলা জ্বালাতে না পারলে খাব কী? তাই বাধ্য হয়েই বেশি দাম দিয়ে কিনছি।” তার মতো অনেকেই বলছেন, বাজারে বিক্রেতাদের কাছে সরকারি দাম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আফিদা খাতুন। তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। এত দাম দিয়ে গ্যাস কিনতে গেলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। সরকার যদি ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমাদের মতো মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।”

আরেক ক্রেতা হাসিব জানান, তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে প্রায় ২০০০ টাকা দিয়েছেন। তার অভিযোগ, বিক্রেতারা সরকারি দাম মানছেন না এবং নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছেন। তিনি বলেন, “সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে সেই দাম কেউ মানছে না। এতে ভোক্তারা অসহায় হয়ে পড়েছে।”

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এলপিজির সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন ধাপে এই মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটছে। উৎপাদক বা আমদানিকারক থেকে শুরু করে ডিলার, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতা—প্রতিটি স্তরেই সিলিন্ডারের দাম বাড়ছে। একটি সিলিন্ডার গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর আগে অন্তত চার দফা হাতবদল হয়। প্রতিটি স্তরে কিছু না কিছু অতিরিক্ত মূল্য যোগ হয়, যার ফলে শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর চাপ পড়ে।

খুচরা বিক্রেতাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ডিলাররা তাদের কাছেই সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করেন। তারা জানান, প্রতি সিলিন্ডারে প্রায় ১০০ টাকা বা তারও বেশি অতিরিক্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এই অতিরিক্ত অর্থের কোনো রশিদ দেওয়া হয় না। ফলে পরবর্তী ধাপে সেই বাড়তি দাম খুচরা বিক্রেতাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করতে হয়।

এই প্রক্রিয়ায় রশিদ জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দামের রশিদ দেখানো হলেও বাস্তবে আরও বেশি টাকা নেওয়া হয়। ফলে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে বাজারে অনিয়ম চালানো সহজ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে এলপিজি আমদানিকারকরা অবশ্য দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। LPG Operators Association of Bangladesh বা লোয়াবের সহ-সভাপতি Humayun Rashid বলেন, লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিইআরসির নির্ধারিত দামের বাইরে গ্যাস বিক্রি করে না। তার মতে, মূল সমস্যা তৈরি হচ্ছে খুচরা পর্যায়ে। তিনি বলেন, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতারা বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করায় সাধারণ ভোক্তারা বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিও বাজার নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান Jalal Ahmed বলেন, এলপিজি বাজারে নজরদারি জোরদার করতে তাদের কিছু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু দাম নির্ধারণ করলেই এলপিজি বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে না। এর জন্য সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি রশিদ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করা এবং বাজারে নিয়মিত অভিযান চালানো জরুরি।

এলপিজি বর্তমানে দেশের বহু পরিবারের রান্নার প্রধান জ্বালানি। বিশেষ করে শহর ও শহরতলিতে যেখানে পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সেখানে এলপিজির ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। ফলে এই বাজারে অনিয়মের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি খাতের যেকোনো অস্থিরতা দ্রুত অন্যান্য খাতে প্রভাব ফেলে। এলপিজির দাম বেশি হলে ছোট রেস্টুরেন্ট, হোটেল এবং খাবার ব্যবসার খরচ বাড়ে। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সরকার যখন শুল্ক ও ভ্যাট কমিয়ে বাজারে স্বস্তি আনতে চেয়েছে, তখন সেই সুবিধা কেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বাজারের অনিয়ম রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সমস্যা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণ ভোক্তারা এখন আশা করছেন, বাজার তদারকি জোরদার করে সরকার দ্রুত এলপিজির বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। কারণ রান্নার গ্যাসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত