প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই গুণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সব ধরনের কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছিল ২০ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই পরিমাণ বেড়ে ৫০ হাজার ৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কার্ডের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে, লেনদেনের ধরণ পরিবর্তিত হয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের চিত্রও বদলেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, আধুনিক পদ্ধতিতে লেনদেনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ায় ক্রমবর্ধমান নগদবিহীন অর্থনীতির প্রভাব স্পষ্ট।
বর্তমানে দেশের ৬১টি ব্যাংক এবং একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফসি) কার্ড সেবা প্রদান করছে। এর মধ্যে ৫৫টি ব্যাংক ডেবিট কার্ড সেবা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে ৫ কোটি ১৮ লাখ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১১৫ শতাংশ।
এছাড়া, বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্ড ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে লেনদেনের গতি এবং নগদ ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশের সব ধরনের কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২২ লাখ, যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বেড়ে ৫ কোটি ৬৯ লাখে পৌঁছেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ ক্রমশ অনলাইন লেনদেন ও ডিজিটাল অর্থ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ব্যাংকের ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে গ্রাহকরা মোট ৩ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা ডিপার্টমেন্ট স্টোর এবং খুচরা দোকানে খরচ হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, দৈনন্দিন জীবনের ক্রয়-বিক্রয়ে কার্ড ব্যবহার এখন সাধারণ মানুষ এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দুয়ের জন্যই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকরাও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। গত বছরের জুলাই মাসে বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা, যা মোট খরচের এক-চতুর্থাংশের বেশি। এছাড়া যুক্তরাজ্য, ভারত, মোজাম্বিক, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও সৌদি আরবের নাগরিকরাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন। এ তথ্য দেশের পর্যটন ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত বহন করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের এই বৃদ্ধির ফলে নগদ অর্থের ব্যবহার কমছে এবং ডিজিটাল অর্থ ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা বাড়ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের সুবিধা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তা কমছে। পাশাপাশি, কার্ডের ব্যবহার বাড়ায় নিরাপদ লেনদেন, ত্রুটিমুক্ত হিসাব, এবং সহজ এবং দ্রুত অর্থ লেনদেনের সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরাঞ্চল ছাড়াও গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল লেনদেনের প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং এবং পস টার্মিনালের মাধ্যমে দোকানদাররা এখন নগদ ব্যয় কমিয়ে কেবল কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের সুবিধা নিচ্ছেন। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন অফার ও ক্যাশব্যাক সুবিধা গ্রহণ করে দৈনন্দিন খরচ আরও সুবিধাজনকভাবে সম্পন্ন করছেন।
বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রবণতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগদবিহীন ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশে প্রতিনিয়ত ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাণিজ্যিক খাতের কার্যকারিতা, লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
মোটকথা, গত পাঁচ বছরে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কার্ডের সংখ্যা বেড়ে ১১৫ শতাংশ, এবং বিদেশি নাগরিকরাও এই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অবদান রাখছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল অর্থ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান, যা নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে দেশের অর্থনীতি আরও আধুনিক ও স্বচ্ছতার পথে এগোতে সহায়তা করছে।