খেলাপি ঋণ কমিয়ে বিনিয়োগে গতি আনতে পারবে কি কেন্দ্রীয় ব্যাংক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৭ বার
কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন বিনিয়োগ, সুদের হার এবং খেলাপি ঋণ—এই তিনটি বিষয় একই সঙ্গে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ব্যবসা ও শিল্প খাতের অনেক উদ্যোক্তা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ার কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ফলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বিনিয়োগের গতি ধরে রাখতে পারবে কি Bangladesh Bank

বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক দেশে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশগুলোতে ঋণের সুদ অনেক সময় ৩৩ শতাংশ থেকে শুরু করে কিছু ক্ষেত্রে শতভাগ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এসব দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের পরিবেশ তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। China, United States, United Kingdom, France, Germany, Saudi Arabia এবং India–এর মতো দেশগুলোতে ২০২৩ সালের পর থেকে ঋণের সুদের হার সাধারণত ২ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। তুলনামূলকভাবে কম সুদের হার বিনিয়োগ পরিবেশকে অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ২০২৪ সাল থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রাখার ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই হার ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা আরও সতর্ক হয়ে উঠছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার বাড়লে ব্যবসার মূলধন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা দ্বিধায় পড়েন। বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাতে বড় বিনিয়োগের আগে ব্যবসায়ীরা লাভের সম্ভাবনা ও ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য হন।

এদিকে সরকার আগামী বছরগুলোতে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিনিয়োগের মন্থরতা দূর করতে সুদের হার কিছুটা শিথিল বা যৌক্তিক পর্যায়ে আনার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান সুদের হার ব্যবসার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, একটি প্রতিষ্ঠান যদি ১৫ শতাংশ মুনাফা অর্জন করতে না পারে এবং একই সঙ্গে ১৫ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানকে লাভজনকভাবে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের আরেকটি বাস্তবতা হলো তারল্য সংকট। কিছু ব্যাংক বর্তমানে লিকুইডিটি সংকটে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি তারা আমানতের সুদের হার কমিয়ে দেয়, তাহলে গ্রাহকেরা সেখানে আমানত রাখতে আগ্রহী হবেন না। ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়।

অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিষয়টি ব্যাংকিং খাতের বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঋণ দীর্ঘদিন ধরে আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয় বরং পুরো অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ ব্যাংকগুলো যদি ঋণ আদায় করতে না পারে, তাহলে তাদের মূলধন ঘাটতি তৈরি হয় এবং নতুন বিনিয়োগে অর্থায়ন করার ক্ষমতা কমে যায়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট বা Bangladesh Institute of Bank Management–এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ কিছু অর্থনৈতিক সূচক ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

তার মতে, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্যাংকিং খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন Institute of Bankers Bangladesh–এর সভাপতি লুৎফুন্নেসা সৌদিয়া খান বলেন, কিছু ব্যক্তি ব্যাংক ঋণ নিয়ে তা সঠিকভাবে ব্যবহার না করে অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছেন। এর ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি মনে করেন, সব উদ্যোক্তা একই ধরনের আচরণ করেন না। অনেক ব্যবসায়ী সৎভাবে ঋণ ব্যবহার করে শিল্প ও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তাই কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো শিল্পখাতকে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়।

অর্থনীতিবিদরা আরও মনে করছেন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে শুধু সুদের হার কমানোই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে আরও কিছু কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা এবং শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাত দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতির সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে এটিকেই দায়ী করছেন উদ্যোক্তারা। ফলে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে, অন্যদিকে সুদের হার এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে বিনিয়োগে গতি ফিরে আসে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।

আগামী সময়েই বোঝা যাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারের সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সময়োপযোগী সংস্কার এবং কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেলে বিনিয়োগের গতি আবারও বাড়তে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত